মৌলভীবাজারের শেরপুরে পৌষ-সংক্রান্তির নবান্ন উৎসবকে ঘিরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। শতবর্ষী এই মাছের মেলা এখন এ অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সুপরিচিত।
লোকমুখে প্রচলিত আছে, প্রায় এক থেকে দেড়শ কিংবা কেউ কেউ বলেন দুইশ বছর ধরে এই মাছের মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মাছ নিয়ে মেলায় অংশ নেন ব্যবসায়ীরা। এখানে খুচরা ও পাইকারি উভয় ধরনের মাছ বিক্রি হয়। মেলা উপলক্ষে পুরো এলাকায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করে।
গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাত থেকে শুরু হওয়া এই মেলা চলবে আগামী বুধবার পর্যন্ত। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের শেরপুর এলাকায় কুশিয়ারা নদীর তীরে বসে এই শতবর্ষী মাছের মেলা। পৌষ-সংক্রান্তি উপলক্ষে দিন-রাতব্যাপী এখানে পাইকারি ও খুচরা মাছ বিক্রি হয়। ছোট-বড় সব ধরনের মাছের পাশাপাশি মেলায় বসেছে বিভিন্ন ধরনের দোকান।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১০০ বছর ধরে পৌষ-সংক্রান্তি ও নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে শেরপুরের কুশিয়ারা নদীর তীরে এই মাছের উৎসব আয়োজন করা হচ্ছে। বরাবরের মতো এবছরও একটি বাঘাইড় মাছের দাম হাঁকা হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকা।
কুশিয়ারা নদীর তীরে শেরপুর বাজারের দক্ষিণ মাঠে এই মেলা বসে। মেলা উপলক্ষে মৌলভীবাজারসহ আশপাশের জেলা থেকে প্রতিবছর কয়েক লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। মেলায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা দু’দিন আগেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাছ সংগ্রহ করে আনেন। সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত বিক্রির জন্য ছোট-বড় নানা জাতের মাছ মজুত রাখা হয়েছে।
মাছের পাশাপাশি মেলায় বড় বড় দোকানে কৃষিপণ্য, আসবাবপত্র, শৌখিন জিনিসপত্র ও শিশুদের খেলনাসহ নানা সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে।
প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়, শত বছর আগে বিভিন্ন হাওর ও কুশিয়ারা নদী থেকে মাছ শিকার করে পৌষ-সংক্রান্তি ও নবান্ন উৎসব উপলক্ষে বিক্রি করা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আয়োজনের পরিসর বেড়ে এখন এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ মাছের মেলায় পরিণত হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, শেরপুরের মাছের মেলা উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মেলায় আগত মাছ ব্যবসায়ী বকুল পাল বলেন, “আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে মাছের ব্যবসা করছি। ঐতিহ্যবাহী এই মেলায় আমরা প্রতি বছর আসি। এখান থেকে পাইকারি মাছ কিনে স্থানীয় বাজারে পৌষ-সংক্রান্তি উপলক্ষে বিক্রি করি।”
মেলায় আসা ক্রেতা রেজওয়ান আহমেদ ও তপু দেব বলেন, “শখের বসে আমরা এই মেলায় আসি। এখানে বড় বড় সব ধরনের মাছ দেখা যায়। সামর্থ্য অনুযায়ী মাছ কিনে নেই। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এখানে এমন বড় মাছ ওঠে যা কল্পনাও করা যায় না। তবে দাম বরাবরের মতোই বেশি। এই মেলা শতবছরের ঐতিহ্য বহন করে আসছে।”
কিশোরগঞ্জ থেকে আসা মাছ ব্যবসায়ী সাহান আহমেদ বলেন, “এই মাছের মেলা দেশের অন্যতম বৃহৎ মেলা। প্রতি বছর আমরা এখানে আসি। পাইকারি মাছ বিক্রি করি, যা পরে দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়।”
মেলায় বড় মাছের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সবসময়ই বেশি। বিশেষ করে বাঘাইড়, বোয়াল, আইড়, চিতল, কাতলা, রুই, সিলভার কার্পসহ নানা প্রজাতির মাছ বেশি দেখা যায়।
এদিকে শেরপুরের মাছের মেলার পাশাপাশি মৌলভীবাজারে পৌষ-সংক্রান্তি উপলক্ষে প্রতিটি বাজারেই মাছের মেলা বসে। গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গাতেই এই উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বড় মাছ সংগ্রহ করে এসব মেলায় বিক্রি করেন।
মৌলভীবাজার মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “শতবর্ষী এই মেলা উপলক্ষে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে মেলায় আগত দর্শনার্থী ও ক্রেতারা নির্বিঘ্নে কেনাকাটা ও ঘুরে দেখতে পারেন।
আমারবাঙলা/এসএবি