রফিক সুলায়মান
মতামত

মহর্ষি মনোমোহন দত্ত বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতের অনিবার্য সম্পদ

রফিক সুলায়মান

বাঙালি ভাববাদী সাহিত্য রচয়িতাগণের মধ্যে তিনি অন্যতম। মাত্র ৩১ কি ৩২ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে রচনা করেছেন কয়েক শত ভাব ও ভক্তিসঙ্গীত। তার রচিত বাণীগুলো নিবিড় ও গভীর অভিনিবেশ সহযোগে পাঠ করলে যে কোনো পাঠকই বিস্মিত হতে বাধ্য হবেন। তিনি সর্বধর্ম সম্মিলনীর পুরোধাপুরুষ। মহর্ষি মনোমোহন দত্ত (১৮৭৭-১৯০৯) এক গানে লিখেছেন— ‘কোরান পুরান আদি বাইবেল কি বেদ/সবে ফুকারিয়া কয় তারা অবিচ্ছেদ।’ তিনি বলেছেন, সকল ধর্মের মর্মবাণী আসলে এক ও অভিন্ন। প্রয়াণের শতবর্ষ পরেও তিনি উজ্জ্বল, জ্যোতির্ময় এবং ভক্তকূলের ভালোবাসায় সিঞ্চিত। তার রচিত বাণীসমূহ আজ অক্ষয়।

তার প্রয়াণের এক যুগ পর নজরুলের অভ্যূদয় ‘বিদ্রোহী’ নিয়ে। উপরে আমি যে চরণটি উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করেছি তেমনি একটি চরণ নজরুলের গানেও আছে— ‘খোদার মসজিদ মূরত মন্দির ঈসায়ী দেউল এহুদখানায়।’ তার অমর গীতিকা সিরিজ ‘মলয়া’ প্রথম খণ্ড এবং দ্বিতীয় খণ্ড আমি সংগ্রহ করেছি। গানের পাশে কিছু নোটসও নিয়েছি। তার বাণীর বৈভব এবং কালোত্তীর্ণ পঙক্তিমালা আমাকে প্রতি মুহূর্ত ভাবিয়ে তুলেছে। এমন মানবিক এবং ঐশ্বর্যপূর্ণ বাণীগুলো বাংলা সাহিত্যের বিদগ্ধ পণ্ডিতগণ যুগ যুগ ধরে উপেক্ষা করে গেছেন বলেই আমি অনুমান করি। ড. শহীদুল্লাহ, জসীম উদ্দিন, আকবর আলি খানের কোনো নিবন্ধ আমি পাইনি মহর্ষিকে নিয়ে। তার দর্শন নিয়ে কথা বলেননি অধ্যাপক আবদুল মতিন বা আনিসুজ্জামান। তার বিশ্বাস এবং আশ্রম-দর্শন নিয়ে লিখেননি কোনো খ্যাতিমান স্কলার। – এ বড় যন্ত্রণার কথা!

‘মলয়া গান’ নিয়ে আমি কথা বলেছি শিল্পী করিম হাসান খান, অধ্যাপক শ্যামাপ্রসাদ ভট্টাচার্য্য, শ্রীমতী কল্যাণী গুহ দত্ত, সাংবাদিক আব্বাসউদ্দিন হেলাল প্রমুখের সঙ্গে। এ ছাড়া বক্তব্য শুনেছি অনেকের। সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাসীমা (মহর্ষি মনোমোহন দত্তের চতুর্থ পুরুষ স্বরূপ দত্ত দয়ালমণীর জননী) আমার আঁধার অন্তরে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছেন ‘মলয়া’ প্রসঙ্গে। ভক্তকূল বিশ্বাস করেন যে মহর্ষি রচিত প্রত্যেকটি গানই ঐশীবাণী। এর নামকরণ তিনি নিজেই করেছেন। সঙ্গীত গুণাকর ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁসাহেব বাণীগুলোতে সুর বসিয়েছেন এবং প্রচার করেছেন। একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। মলয়া গান শতভাগ উত্তর ভারতীয় রাগনির্ভর, তাই এর গায়নশৈলী অন্যান্য ফকিরী বা ভাববাদী গান থেকে আলাদা। কয়েকটি গানের উল্লেখ করছি— ‘যার মন উদাসী হয়েছে পাগলারে/হিন্দু মুসলমান কে কয় চিনি না তারে’ (খাম্বাজ, একতালে), ‘ভাবান্তরে কেন ভাবাও/জাগিয়ে ঘুমিয়ে থাক ফিরে নাহি চাও’ (নটনারায়ণ, ধামাল), ‘যার সনে যার মন বাঁধা নয়ন বাঁধা যার রূপে’ (পিলু, খেমটা), ‘দীনের দিন কি এমনি যাবে আমি ভেবে মরি তাই’ (ঝিঁঝিট, ঠুমরী), ‘বিলাসেতে কর্মযোগ পেয়ে পূর্ণ অধিকার’ (কালাংড়া, কাওয়ালী ঠেকা), হরিনামে মন মজায়ে দয়াময়ের পূর্ণ ছবি’ (কাফি, একতাল) ইত্যাদি। বাণীর শুরু এবং রাগ ও তালের নাম চিহ্নিত করায় গানগুলো অন্যান্য আশ্রমভিত্তিক গান থেকে নিঃসন্দেহে স্বাতন্ত্রের দাবীদার। এই দুরূহ কাজটি করেছেন মহর্ষির অন্যতম শিষ্য সঙ্গীত গুণাকর ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁসাহেব। তার আরেক পরিচয় তিনি ছিলেন সুরসম্রাট আলাউদ্দীন খাঁসাহেবের অগ্রজ।

একটা বিভ্রান্তি দীর্ঘদিন ছেয়ে আছে ‘মলয়া’ গান নিয়ে। কোনো কোনো গবেষক মনে করতেন যে মলয়া গান বোধ হয় মনোমোহন-লব পাল-আফতাবউদ্দিন খাঁসাহেবের যৌথ সৃষ্টি। তাদের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে বুঝি ‘মলয়া’র সৃষ্টি। কিন্তু তারা ‘মলয়া’ এবং ‘মলআ’র সাধারণ সরল পার্থক্যটুকু কেন ধরতে পারলেন না– এটি এক ঘোরলাগা বিস্ময়। মহর্ষি মনোমোহন ‘মলয়া’ শব্দটি নিয়েছেন ‘মলয়’ থেকে। তার রচিত বাণীগুলো সৃষ্টি হয়েছে ধ্যান ও আরাধনার এক গভীর স্তর থেকে। মলয় শব্দের অভিধানগত অর্থ ‘স্নিগ্ধ দখিনা পবন।’ তার গানের সুর ও বাণী ভক্তের হৃদয়ে সত্যি দখিন হাওয়ার পরশ আনে। বাংলা সাহিত্যের অমর দুই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামও ‘দখিনা পবন’ নিয়ে গান রচনা করেছেন।

সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার, জাতপাতের গোঁড়ামী, ধর্মীয় মৌলবাদের অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন তিনি। তার রচনা বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতের এক অনিবার্য সম্পদ। তিনি আমাদের মহামিলনের এক বাতিঘর; এক সাংস্কৃতিক হৃদপিণ্ড। নজরুলেরও আগে হিন্দু-মুসলমান মিলনের জন্যে তিনি জয়গান অনন্ত গেয়েছেন। তাই তার রচনা মৌলিক জ্ঞান হিসেবে স্বীকৃত। এমন একজন মহাপুরুষ জন্মেছিলেন এই বাংলায়। এ আমাদের গর্ব।

রফিক সুলায়মান : লেখক ও শিল্প-সমালোচক।

আমারবাঙলা/এমআরইউ

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

লামায় পাহাড় ধসে শিশুসহ নিহত ৫, আহত ইউপি সদস্য

পার্বত্য জেলার বান্দরবানের লামা উপজেলায় পাহাড় ধসে ১ শিশুসহ দুই পরিবার...

পাহাড়ে ধসে পড়ার আশঙ্কায় চাম্বি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ভবন

পার্বত্য জেলার বান্দরবানের লামায় উপজেলা আজিজ নগরে টানা চার দিনের প্রব...

পুরাতন ব্রহ্মপুত্রে সেতু নেই, দ্রুত সেতু নির্মাণের দাবি এলাকাবাসীর

নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের, দৌলতপুর গ্রাম এবং গাজীপুরের কাপাস...

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি নাগরিককে গুলি করে হত্যা

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়ায় খাবার সরবরাহের কাজ কর...

১০ স্টেশনে বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে নদীর পানি, ঝুঁকিতে সিলেট-চট্টগ্রাম

সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং উজানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের উত্তর-...

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যানকে ফুলেল শুভেচ্ছা

বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ...

জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত...

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ অব্যাহত: বাণিজ্যমন্ত্রী

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে বলে...

দাপ্তরিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা জারি

দাপ্তরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং চলমান আলিম পরীক্ষা-২০২৬ সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নভাবে...

মেট্রোরেলের কমলাপুর অংশ নিয়ে অনিশ্চয়তা

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণ প্রক...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা