ডা. মোহাম্মদ নূরুল্লাহ
মতামত

শিশুদের ডেঙ্গু ও আমাদের করণীয়

ডা. মোহাম্মদ নূরুল্লাহ

ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু হয়। সাধারণত জুলাই মাস থেকে অক্টোবর মাসের কাছাকাছি সময় ডেঙ্গু হয়। এ রোগ হওয়ার প্রবণতা এখন ডিসেম্বরেও দেখা যাচ্ছে। ডেঙ্গুর ধরন ও হওয়ার সময়কালও বদলে যাচ্ছে। তাই বলা চলে এখন আমরা একটা ডেঙ্গুময় সময়ে আছি। বর্তমানে আমাদের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীতে সয়লাব হয়ে গিয়েছে। আমরা প্রতিদিন অনেক রোগী পাচ্ছি এবং শয্যা সংকটের কারণে আমরা অনেককেই ভর্তি করতে পারছি না।

তবে আশার কথা সব ডেঙ্গু রোগীকে ভর্তির প্রয়োজনও নেই। আমরা যদি শুরু থেকেই ডেঙ্গু রোগী সনাক্ত করতে পারি তবে রোগী বাসায় বসেই চিকিৎসা নিতে পারবে। এখানে আমাদের সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ: ডেঙ্গু রোগে সাধারণত জ্বর হয় । এই জ্বর ১০২ থেকে ১০৩ ডিগ্রি ফা. হতে পারে এবং এই জ্বরের সাথে শরীর ব্যথা, বমি বমি ভাব, পাতলা পায়খানা, চোখের নিচে ব্যথা, ক্ষুধামন্দা এগুলো হতে পারে। তবে সব রোগীর কিন্তু সব সমস্যা নাও থাকতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা জ্বর হলেই ডেঙ্গু ভাইরাসের পরীক্ষা দিচ্ছি এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পজিটিভ পাচ্ছি। বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও ডেঙ্গুতে খুব বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের হাসপাতালে সাধারণত তিন ভাগের এক ভাগ শিশু ডেঙ্গু রোগী পাচ্ছি।

ডেঙ্গু হলে কী করব: প্রথমত, যে বাচ্চাদের জ্বর থাকে তাদেরকে আমরা ডেঙ্গু পরীক্ষা করব । খুব সহজে আমরা পরীক্ষা করতে পারি । আমরা প্রথম দিন রক্তের সিবিসি এবং ডেঙ্গু অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করে থাকি । অ্যান্টিজেন আমরা তিন দিন পর্যন্ত পরীক্ষা করি তারপর পাঁচ দিন সাধারণত অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করতে পারি।

প্লাটিলেট নিয়ে অহেতুক ভয় নয়: সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা হয়েছে যে, প্লাটিলেট কমে গেলেই রোগী খারাপ হয়ে যাবে তাই তারা অনেক সময় প্লাটিলেট ভালো থাকলে রোগীগুলোকে নিয়ে হাসপাতালে আসতে চাচ্ছে না এবং অবহেলা করছে । একটি ডেঙ্গু রোগী খারাপ হওয়া আমরা অনেকভাবে বুঝতে পারি, তার মধ্যে প্লাটিলেট একটি মাধ্যম মাত্র। ডেঙ্গু রোগী সন্দেহ হলে আমরা সাধারণত সিবিসি পরীক্ষা করি এবং সম্পূর্ণ শ্বেতকণিকা, রক্তের তরল অংশ ও কনিকাগুলোর অনুপাত যাকে আমরা হেমাটোক্রিট বলি ইত্যাদি দেখে আমরা বুঝতে পারি যে একটি শিশু স্বাভাবিক অবস্থা থেকে খারাপ দিকে যাচ্ছে কিনা এবং তখনই আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেই। এই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার কারণেই বেশিরভাগ ডেঙ্গু রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি সাধারণ মানুষের মতো শুধু প্লাটিলেটের দিকে তাকিয়ে থাকি তবে ভুল হবে ও খুব বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার শঙ্কার থাকে। অনেক সময় প্লাটিলেট ভালো থাকা অনেক রোগী খারাপ হয়ে যাচ্ছে আবার প্লাটিলেট খুব কম থাকা রোগী ও ভালো হয়ে যাচ্ছে।

ডেঙ্গু সাধারণত বিভিন্ন রকম তীব্রতা নিয়ে হয়, যেমন স্বাভাবিক ডেঙ্গু যার বাড়িতে চিকিৎসা সম্ভব শুধু বেশি বেশি তরল খাবার প্রদানের মাধ্যমে । অথবা ডেঙ্গুর সঙ্গে আরো অনেকগুলো বিপদ চিহ্ন থাকতে পারে যেমন- শরীরের কোথাও রক্তপাত হওয়া , তীব্র পেটে ব্যথা, শিশু নিস্তেজ হয়ে যাওয়া, বার বার বেশি বেশি বমি হওয়া ।

তাই প্রথমে একটি রোগী জ্বর নিয়ে আসলে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে যে তার ডেঙ্গু আছে কি নেই এবং ডেঙ্গু থাকলে আমরা কিছু ওষুধ খেতে নিষেধ করি। যেমন- কোনো রকম ব্যথার ওষুধ না খাওয়া, অ্যান্টিবায়োটিক না দেওয়া, স্টেরোয়েড জাতীয় ওষুধ না খাওয়ানো।

ডেঙ্গু হলে কী করবেন: প্রথমত বাচ্চাকে বারে বারে তরল খাবার খাওয়ান। যেমন- খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, গ্লুকোজের পানি, চিড়ার পানি অথবা যে কোনো রকম তরল বারবার বেশি বেশি করে খাওয়াতে হবে যাতে একটি বাচ্চা ২৪ ঘণ্টায় কমপক্ষে ছয় বার প্রস্রাব করে। এতে বোঝা যাবে আপনার বাচ্চা পানিশূন্যতা রোধ করতে সক্ষম হয়েছে। তারপরেও আমাদের কিছু বাচ্চা আছে যাদের হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন হয়। ভর্তি করে আমরা স্যালাইন ও অন্যান্য চিকিৎসা দেই। সবসময় ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া এবং ডাক্তারের পরামর্শ মতো ও সময় মতো ঠিকভাবে ভর্তি করলে এবং স্যালাইন ও অন্যান্য চিকিৎসা নিলে এই বাচ্চাগুলো খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে যেতে পারে। যে বাচ্চার ডেঙ্গু হয়েছে তাকে সারাদিন বাসার মধ্যে মশারির ভিতরে পর্যাপ্ত বিশ্রামে রাখতে হবে, যাতে আরেকটি সুস্থ মানুষকে সেই ডেঙ্গু ছড়িয়ে দিতে না পারে।

সচেতনতা: ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে আমাদের কিছু সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে তার মধ্যে একটি হলো যে এডিস মশার আবাসস্থল ধ্বংস করা । এডিস মশা সাধারণত আমাদের খুব কাছে আমাদের ঘরের চার পাশেই থাকে এবং যেই জিনিসগুলো আমরা সাধারণত ব্যবহার করি সেগুলোতে তারা বংশবৃদ্ধি করে। যেমন আমাদের ফুলের টব, ডাবের খোসা, ফ্রিজের জমে থাকা পানি, ফেলে দেওয়া বোতল, টায়ার, ছাদ বাগানের জায়গা। এ সব জায়গায় তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকলে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি হতে পারে। পানি যেন তিনদিনের বেশি জমে থাকতে না পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে এবং আমরা যদি দিনের বেলা বিশ্রাম নেই তাহলে অবশ্যই মশারি টাঙাতে হবে কারণ এইডিস মশা দিনের বেলায় কামড় দেয়।

ডেঙ্গু নিয়ে আমরা কিছু বার্তা দিতে সাধারণ জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারি, যেমন- ‘ফুলের টব ডাবের খোসা প্লাস্টিকের কৌটা/ডেঙ্গুর আবাসস্থল- থাকবে না পানি এক ফোঁটা’; ‘যদি ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে চান/এডিস মশার বংশবৃদ্ধি কমান’; ‘ছোট্ট একটি মশা-সাবধান/ডেঙ্গু প্রতিরোধে হও আগুয়ান’।

শেষে বলতে চাই যে ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবং ডেঙ্গুর চিকিৎসায় সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি সচেতন থাকি তাহলে ডেঙ্গু হওয়ার শঙ্কা খুব কম। আর যদি ডেঙ্গু হয়েও যায় তবে সময়মতো চিকিৎসা নিলে একটি মৃত্যুও আর ডেঙ্গু থেকে হবে না।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ।

আমারবাঙলা/এমআরইউ

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

কৃষকের ন্যায্য মূল্যের দাবিতে কলাপাড়ায় সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় কৃষকদের ন্যায্য অধিকার ও ধানের লাভজনক দাম নিশ্চিতের দাবিত...

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ জেলা ও বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায়

বাংলাদেশে এক দশকে বজ্রপাতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর তথ্য দিচ্ছে...

রেকর্ড গড়ে নিউজিল্যান্ডকে হারাল বাংলাদেশ

জয় দিয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ শুরু করেছে বাংলাদেশ। তাওহিদ...

যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ বাংলাদেশি ছাত্রীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন পর ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার বা...

চ্যাটজিপিটির কাছে লাশ গুমের উপায় জানতে চেয়েছিলেন অভিযুক্ত

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্...

কৃষকের ন্যায্য মূল্যের দাবিতে কলাপাড়ায় সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় কৃষকদের ন্যায্য অধিকার ও ধানের লাভজনক দাম নিশ্চিতের দাবিত...

৩ দিনের রিমান্ডে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন

চিকিৎসা শেষে মিরপুর মডেল থানার হত্যা মামলায় ফের তিন দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়ে...

রেকর্ড গড়ে নিউজিল্যান্ডকে হারাল বাংলাদেশ

জয় দিয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ শুরু করেছে বাংলাদেশ। তাওহিদ...

চ্যাটজিপিটির কাছে লাশ গুমের উপায় জানতে চেয়েছিলেন অভিযুক্ত

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্...

ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পে ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করা হবে: অর্থমন্ত্রী

ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা