চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) এলাকায় শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। রবিবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিন এ আদেশ জারি করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেইট বাজারের পূর্ব সীমা থেকে পূর্বদিকে রেলগেইট পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশে আজ রবিবার (৩১ আগস্ট) দুপুর ২টা থেকে আগামীকাল সোমবার রাত ১২টা পর্যন্ত ১৪৪ ধারার আদেশ জারি করা হয়।
এর আগে সংঘর্ষের সময় ইটের আঘাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিনসহ অন্তত ৫০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষে উভয় পক্ষই ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালালে এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
সরজমিনে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে এক পাশে কয়েক শ শিক্ষার্থী অবস্থান নেন। বিপরীত দিকে অবস্থান নেন স্থানীয়রা। এ সময় সহ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান, মো. কামাল উদ্দিন, প্রক্টর তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফসহ শিক্ষকেরা দুই পক্ষকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। সশস্ত্র স্থানীয়রা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা শুরু করে। তারা রামদা দিয়ে কয়েকজনকে কুপিয়ে আহত করে। আহত অবস্থায় অন্তত ১০ শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের দিকে নিয়ে যেতে দেখা যায়। তাদের মাথা থেকে রক্ত ঝরছিল। তবে ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাউকে দেখা যায়নি।
গতকাল শনিবার (৩০ আগস্ট) রাতে চবি’র এক ছাত্রীকে বাসার দারোয়ান কর্তৃক মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ ঘটনায় আজ রবিবার (৩১ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় ৭০ জনের অধিক শিক্ষার্থী আহত হন। এরমধ্যে ৩০ জন শিক্ষার্থীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল (চমেক) কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির দুই সদস্যও আহত হয়েছেন।
এদিন সাড়ে ১১টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় স্থানীয়রা। ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশের ২টি, নিরাপত্তার বাহিনীর ১ টি এবং প্রক্টরিয়াল বডির ১টিসহ মোট ৪টি গাড়ি ভাঙচুর করেছে স্থানীয়রা।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের তথ্যমতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকার একটি বাসায় ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী ভাড়া থাকেন। শনিবার (৩০ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাসায় প্রবেশের চেষ্টা করলে কেন দেরিতে এসেছেন, তাই গেট খুলতে রাজি হননি দারোয়ান। দীর্ঘক্ষণ চিৎকার-চেঁচামেচির পর একপর্যায়ে গেট খোলা হয় এবং কেন চেঁচামেচি করছেন এজন্য ওই ছাত্রীকে থাপ্পড় মারেন দারোয়ান। পরে ওই ছাত্রী তার কয়েকজন সহপাঠীকে ফোন দিলে তারা আসেন এবং দারোয়ানের ওপর চড়াও হন। তারা দারোয়ানকে আটকানোর চেষ্টা করলে সে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। এ সময় খবরটি ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে আরো শিক্ষার্থী সেখানে জড়ো হন। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা তাকে ধাওয়া করলে স্থানীয়রা একত্র হয়ে ইট–পাটকেল মারা শুরু করেন। তখন সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের বাসার গেট রাত সাড়ে ১১টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। আজকে কাজে বাইরে গিয়েছিলাম, ১১টার দিকে ফিরে এসে দেখি গেট বন্ধ। আমি অনেকবার ধাক্কা দিয়েছি, রুমমেটরা অনুরোধ করেছে, কিন্তু দারোয়ান খোলেননি। পরে গেট খুলে আমাকে উদ্দেশ্য করে খারাপ ব্যবহার করে এবং ভেতরে ঢুকতে না দিয়ে দু’বার ধাক্কা দেয়। জোর করে ঢুকতে চাইলে সে আমাকে লাথি-থাপ্পড় মারে।’
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক শিক্ষার্থী জানান, মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। হামলার সময় বাচামিয়ার দোকানের সামনে শিক্ষার্থীরা গেলে ৩টা টর্চ লাইটের আলো ফেলে হামলা করা হয়। এসময় স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল।
রাত ৩টার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ওপর ন্যাক্কারজনক হামলা হয়েছে। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। এরমধ্যে অনেকের পরীক্ষাও রয়েছে। তাই আজ রবিবার(৩১ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পরীক্ষা স্থগিত করা হলো।’
আমারবাঙলা/এফএইচ