আকাশপথে পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে সবজি পাঠানো থমকে গেছে। ফলে রপ্তানিকারক, কৃষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। সবজি ছাড়াও বাংলাদেশের কৃষিপণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং হিমায়িত মাছের রপ্তানি কার্যত বন্ধ রয়েছে। বিস্কুট, নুডলস, ফ্রুট ড্রিংকস, পরোটা, সুগন্ধি চাল, চানাচুরসহ নানা কৃষিজাত পণ্যও এখন বিদেশে পাঠানো যাচ্ছে না।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশের আকাশসীমা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহ, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কোনো সবজি পাঠানো যাচ্ছে না। সংকট যদি দীর্ঘ হয় তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সবজির বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা প্রতিযোগী দেশের ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যেতে পারে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) পাঁচ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। তবে ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৮ শতাংশ কমে যায়। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি হয়েছিল চার কোটি ৫৮ লাখ ডলারের সবজি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে আট কোটি ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবে এক কোটি ১৬ লাখ ডলার, ইউএইতে ৯৯ লাখ ডলার, কাতারে ৪১ লাখ ডলার, কুয়েতে ৩১ লাখ ডলারের সবজি যায়। এর বাইরে যুক্তরাজ্যে এক কোটি ৫৫ লাখ ডলার, ইতালিতে ৩৬ লাখ ও কানাডায় ২৩ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শীত মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে দিনে ৩৫ থেকে ৪০ টন সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের গন্তব্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান। এর বাইরে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয় সবজি। বর্তমানে ১৮০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত সবজি রপ্তানি করে। সবজির পাশাপাশি মৌসুমি ফলমূলও রপ্তানি করেন এই ব্যবসায়ীরা।
তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এখন সৌদি আরবের জেদ্দা ও মদিনায় সীমিত ফ্লাইট গেলেও রাজধানী রিয়াদে যাচ্ছে না। অথচ রিয়াদেই বাংলাদেশের সবজির সবচেয়ে বড় বাজার। এ ছাড়া কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস এয়ারলাইন্সসহ কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা তাদের অনেক ফ্লাইট স্থগিত করেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পাঠানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর বলেন, এখন টরন্টো, যুক্তরাজ্য ও ইতালির রোম– এই তিন গন্তব্যে সামান্য কিছু পণ্য যাচ্ছে। বাকি প্রায় সব বাজারেই রপ্তানি বন্ধ। এতে প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, গ্রীষ্মকালে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে স্থানীয় সবজি উৎপাদন কমে যায়। ফলে ওই সময়ে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি চার থেকে পাঁচ গুণ বাড়ে।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্র জানায়, সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যগামী বহু ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। শুধু সোমবারই বাতিল হয়েছে ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যের ৩৯টি ফ্লাইট। এর আগে শনিবার বাতিল হয় ২৩টি এবং রোববার বাতিল হয় ৪০টি ফ্লাইট। অর্থাৎ তিন দিনেই বাতিল হয়েছে ১০২টি ফ্লাইট। এসব ফ্লাইটের বেশির ভাগের গন্তব্য ছিল দুবাই, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েত। ফ্লাইট হঠাৎ বন্ধ হওয়ায় অনেক রপ্তানিকারকের পণ্য বিমানবন্দরে আটকে থেকে নষ্ট হয়েছে।
চট্টগ্রামভিত্তিক গ্রিন ওয়ার্ল্ড ইমপ্যাক্ট গত শনিবার সকালে প্রায় এক টন তাজা সবজি দুবাই পাঠাতে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে যায়। তবে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় চালানটি আর পাঠানো সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত পণ্যগুলো নষ্ট হয়ে প্রায় এক হাজার ২০০ ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ মাহবুব রানা বলেন, চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ ডলারের তাজা ফল ও সবজি রপ্তানি হয়। ফ্লাইট বাতিলের পর অধিকাংশ পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। অনিশ্চয়তার কারণে নতুন চালানও প্রস্তুত করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি কবির আহমেদের হিসাবে, মার্চের শুরুতে ঢাকার বিমানবন্দরে এক হাজার ২০০ টনের বেশি কার্গো আটকে ছিল। ঢাকা থেকে এখনও কার্গো ফ্লাইট পুরোপুরি চালু হয়নি। ফলে সবজি রপ্তানিকারকরা পণ্য পাঠাতে হিমশিম খাচ্ছেন। কয়েকটি অপারেটর সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চালাচ্ছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পৌঁছাতে কিছু রপ্তানিকারক এখন চীন, মালয়েশিয়া ও হংকং হয়ে পণ্য পাঠাতে শুরু করেছেন, তবে এতে সময় ও খরচ বাড়ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ঢাকা থেকে রোম, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে পণ্য পরিবহন করছে। তবে ৫ মার্চ থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রগামী কার্গোর ভাড়া প্রতি কেজিতে ৫০ সেন্ট বাড়িয়েছে বিমান।
বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এয়ারলাইন্স এমিরেটস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ৪ মার্চ পর্যন্ত দুবাইয়ে যাওয়া-আসার সব ফ্লাইট স্থগিত রাখা হয়েছে। শুধু সীমিত আকারে প্রত্যাবাসন ও কার্গো সেবা চলবে। অন্য এয়ারলাইন্সগুলো ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে অথবা পুরো অঞ্চল এড়িয়ে চলছে।
আমার বাঙলা/আরএ