সেন্টমার্টিন দ্বীপ ভ্রমণকে কেন্দ্র করে টিকিট ও প্যাকেজ ব্যবসায় ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। ভুয়া ও অনিয়ন্ত্রিত ট্রাভেল এজেন্সির প্রতারণায় গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত কয়েক ডজন পর্যটক আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। ট্যুরিস্ট পুলিশের হস্তক্ষেপে ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় প্রায় ৮ লাখ টাকার বেশি অর্থ উদ্ধার করা হলেও অনেক অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন রয়েছে।
নিজেকে জাহাজ মালিক পরিচয়, পরে উধাও
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ উঠেছে ওশান কমিউনিকেশন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস–এর বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. ইদ্রিস আলী নিজেকে জাহাজের মালিক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পর্যটকদের কাছ থেকে আগাম টাকা আদায় করেন।
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার বাসিন্দা মো. কামরুল ইসলাম তাঁর মাদ্রাসার ৪৭ জন ছাত্র নিয়ে কক্সবাজার–সেন্টমার্টিন ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের জন্য টিকিট ও হোটেল বুকিং বাবদ ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা প্রদান করেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও টিকিট না পেয়ে তারা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন।
পর্যটকদের অভিযোগের পর ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের একটি দল তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে ইদ্রিস আলী ও তাঁর সহযোগীকে আটক করে এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে পুরো টাকা ফেরত নিশ্চিত করে।
একাধিক অভিযোগ, একই এজেন্সি
ওশান কমিউনিকেশনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
-
সিরাজগঞ্জের রাশিদাজ্জোহা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সুলতানা সালমা হোসেনের কাছ থেকে ব্যাংক ও বিকাশের মাধ্যমে নেওয়া হয় ২ লাখ ১২ হাজার ৬৫০ টাকা।
-
বিমান বাহিনীর একজন স্কোয়াড্রন লিডারের কাছ থেকে নেওয়া হয় ১১ হাজার ২০০ টাকা।
সব কটি ঘটনায় ট্যুরিস্ট পুলিশের সহায়তায় অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব অনিয়মের কারণে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সব কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
নকল টিকিট, জাহাজঘাটেই ধরা
আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনায় Rafsan Tourist & Travel BD নামের একটি এজেন্সি পর্যটকদের নকল টিকিট সরবরাহ করে। ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ফেসবুকের মাধ্যমে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ১৫ জন পর্যটকের জন্য টিকিট দেওয়া হয়। এর মধ্যে এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেসের ১১টি টিকিট জাল প্রমাণিত হয়।
ফলে পর্যটকেরা সেন্টমার্টিন যেতে না পেরে ১ লাখ ৪৪ হাজার ১০০ টাকা ফেরতের দাবি জানান। দীর্ঘ গড়িমসির পর ট্যুরিস্ট পুলিশের হস্তক্ষেপে পুরো টাকা উদ্ধার করে পর্যটকদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
অনলাইনে চুক্তি, প্রতিনিধি নেই
Fanus Traveller BD নামের একটি অনলাইনভিত্তিক এজেন্সি সিরাজগঞ্জের পর্যটক মাসুদ রানার কাছ থেকে ২টি টিকিটের জন্য ১১ হাজার ৫০০ টাকা নেয়। নির্ধারিত দিনে জাহাজঘাটে কোনো প্রতিনিধি না পাওয়ায় প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসে। অভিযোগের পর ট্যুরিস্ট পুলিশ টাকা উদ্ধার করে দেয়।
প্রতারণার অভিযোগে মামলা, একজন গ্রেপ্তার
সবচেয়ে বড় প্রতারণার অভিযোগ ওঠে SA Tour & Travels ও আশুলিয়া ট্যুর গ্রুপ–এর বিরুদ্ধে। ১৩০ জন পর্যটককে নিয়ে কক্সবাজারে অবস্থান শেষে তারা হোটেল ও রেস্তোরাঁর ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকার বেশি বিল পরিশোধ না করে পালানোর চেষ্টা করে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ অভিযান চালিয়ে একজনকে আটক করে। এ ঘটনায় কক্সবাজার সদর থানায় ৪০৬/৪২০/৩৪ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। একজন আসামি বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছেন।
এখনও উদ্ধার হয়নি টাকা
হিলশা ট্যুরিজম নামের একটি এজেন্সির বিরুদ্ধে ১৯ জন পর্যটকের কাছ থেকে ২ লাখ ১৪ হাজার ২৩২ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নকল টিকিটের কারণে জাহাজ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয় পর্যটকদের এবং জাহাজ কর্তৃপক্ষকে জরিমানা করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ সত্ত্বেও এখনো টাকা ফেরত দেয়নি এজেন্সিটি। ট্যুরিস্ট পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের সতর্কবার্তা
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের ডিআইজি আপেল মাহমুদ জানিয়েছে, সেন্টমার্টিন ভ্রমণের আগে অবশ্যই নিবন্ধিত ও অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সি যাচাই করতে হবে। ফেসবুক গ্রুপ বা ব্যক্তিগত আইডির মাধ্যমে লেনদেন না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন মৌসুমে অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন ট্রাভেল ব্যবসা বন্ধে দ্রুত সমন্বিত নজরদারি ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। নইলে পর্যটকদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আমারবাঙলা/এনইউআ