গত বছরের ১০ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন উপদেষ্টা পরিষদের দুই ছাত্র প্রতিনিধি আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম। সে সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের পদত্যাগ কার্যকর হবে। পরদিন, ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়।
এরপর ২৪ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখশ চৌধুরীর পদত্যাগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যাচ্ছে, পদত্যাগের প্রায় ৫০ দিন পার হলেও আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলম এখনো সরকারি বাসা ছাড়েননি।
এই সময়ের মধ্যেই আসিফ মাহমুদ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। যদিও তিনি দাবি করেছেন, সরকারি বাসা তিনি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছেন। তবে বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাতে হেয়ার রোডে অবস্থিত তার বরাদ্দকৃত সরকারি বাসা ‘নিলয়-৬’-এ গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাসাটি এখনো তার ব্যবহারে রয়েছে। সেখানে দায়িত্বরত একাধিক কর্মচারী জানান, তিনি নিয়মিতই বাসাটিতে আসেন।
তারা আরও জানান, আসিফ মাহমুদ বেশিরভাগ সময় পরিবাগে অবস্থান করলেও হেয়ার রোডের বাসাটি কার্যত তার কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আশপাশের বাসায় দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সদস্যও জানান, সেখানে নিয়মিত লোকজন আসা-যাওয়া করে এবং তিনি সেখানে অবস্থান করেন।
তবে এসব তথ্য অস্বীকার করে আসিফ মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, প্রায় এক মাস আগে তিনি সরকারি বাসা ছেড়ে পরিবাগের বাসায় চলে গেছেন এবং বর্তমানে সরকারি বাসায় থাকছেন না।
অন্যদিকে, মাহফুজ আলম হেয়ার রোডের ‘উত্তরায়ণ-৩’ নম্বর ডুপ্লেক্স বাংলোতে বসবাস করছেন। তিনি জানান, আবাসন নীতিমালায় উপদেষ্টাদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ নেই। তবে তিনি নির্বাচনের আগেই সরকারি বাসা ছাড়বেন বলে আশ্বাস দেন।
এ বিষয়ে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান জানান, সাবেক দুই উপদেষ্টার বাসা ছাড়ার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনো নির্ধারিত হয়নি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে অবসর বা বদলির পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাসায় থাকার সুযোগ থাকলেও মন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের বিষয়ে নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্ট সচিবকে অবহিত করেছেন এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সেই দিন থেকেই আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। অপরদিকে, মাহফুজ আলম ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ পান এবং ১০ নভেম্বর উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। পরে তাকে তথ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পদত্যাগের পরও সরকারি বাসা ব্যবহার অব্যাহত থাকায় এই দুই সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে নীতি ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, অতীতে পদত্যাগকারী মন্ত্রীরা দায়িত্ব ছাড়ার আগেই সরকারি সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করেছেন। তার মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নৈতিকতার এই অবক্ষয় উদ্বেগজনক এবং এ ধরনের আচরণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য নেতিবাচক উদাহরণ তৈরি করছে।
আমারবাঙলা/এসএবি