সংগৃহীত
মতামত

বাঙালির উৎসব বাংলা নববর্ষ

ড. ফোরকান আলী

পহেলা বৈশাখ- বাংলা নববর্ষ। বাঙালির প্রাণের উৎসব। এই জনপদে সবচেয়ে বড় লোকায়ত উৎসব। যে উৎসবের ডাকে সাড়া দিতে বর্ষ ও জাতপাতের বিভেদ অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে না। ‘এসো হে বৈশাখ’ বলে আবাহন জানাতে মনপ্রাণ তাই আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠে। পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ উদযাপনে তাই নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনার সঞ্চার ঘটেছে।

আগামীকাল ১৪৩২ সনের প্রথম দিন- পহেলা বৈশাখ ১৪৩২। অর্থাৎ নববর্ষ হিসেবে এ দিনটির প্রবর্তন ঘটেছিল ১৪৩১ বছর আগে। বর্ষ গণনার এ রীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মোগল বাদশাহ মহামতি আকবরের নাম। আকবর চন্দ্রবর্ষ হিজরির সঙ্গে সৌরবর্ষ গণনার সংযোগ ঘটিয়ে যে নতুন পদ্ধতিতে বর্ষরীতি চালু করেন। তাই এ দেশে বঙ্গাব্ধ বা বাংলা সন হিসেবে প্রচলিত। ইতিহাস অন্তত তাই বলে। এখানে প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয়। আকবরের মূল সাম্রাজ্য বলতে গেলে বাইরে একটি প্রান্তিক এলাকা এই বাংলায় এ রীতি এমন জনপ্রিয়তা কেমন করে পেল যে, আজও এমন জনপ্রিয় এবং সচল রয়ে গেছে? এ প্রশ্নের জবাবে এই বঙ্গাব্দে প্রচলন পূর্ববর্তী ফসলি সন কিংবা পরগনাইতি সনের সঙ্গে এর কিছু সঙ্গতি আন্দাজ করা যায়। তবে নববর্ষ উদযাপনে এসব পণ্ডিতি বিতর্কে মাথা না গলালেও চলে। নববর্ষ পহেলা বৈশাখ ১৪৩১ বছরের পুরনো হলেও তা উদযাপনের ইতিহাস কিন্তু অতটা প্রাচীন নয়। এ উদযাপনকে অর্বাচীনই বলা চলে।

এর মূল কারণটা হচ্ছে এই যে, এ দেশের নববর্ষ উদযাপন বা এ উপলক্ষে উৎসব আয়োজনের কোনো প্রচলনই ছিল না। ফসলি সন বা পরগনাইতি সনে বছর শুরু হতো ফসল তোলার শুরু থেকে। নবান্ন উৎসবই তাই ছিল নববর্ষ উদযাপনের বিকল্প। অনেক পরেও দেখা গেছে নতুন বছর আবাহনীর চেয়ে বর্ষবিদায় বা চৈত্রসংক্রান্তি ছিল অধিকতর গুরুত্ববহ। নওরোজ নামে নববর্ষ উৎসব এই উপমহাদেশে আসে মুসলমানের হাত ধরে। সুলতান বা বাদশাহদের পৃষ্ঠপোষকতায় নওরোজ বা নববর্ষ উদযাপনে হিজরি সনেরই ছিল প্রাধান্য। আর সব সময় যে বছরের প্রথম দিনটিতেই উৎসব শুরু হতো এমনও নয়। সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে কয়েক দিন এদিক-সেদিক করায় বাধা ছিল না। সাধারণত তেমনটাই করা হতো। শাহী দরবারের রীতি-নীতি, আচার-আচরণ স্বাভাবিকভাবেই নিচের দিকে গড়ায়। নওরোজ উৎসব ক্রমে প্রাদেশিক আর সামন্তরের ও বিস্তার লাভ করে।

অন্যদিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে, পহেলা বৈশাখের একটা উদযাপনাও ঠাঁই করে নেয়। তা হচ্ছে জমিদারি সেরেস্তার পুণ্যাহ আর মহাজনী গদির ‘হালখাতা’। ‘পুণ্যাহ’ আর ‘হালখাতা’য় কিছুটা উৎসবের আমেজ থাকলেও একে কোনোভাবেই আমজনতা বা সাধারণ মানুষের উৎসব বলা যায় না। কেননা পুণ্যাহে জমিদাররা খাজনাপাতি আর হালখাতায় মহাজন-ব্যবসায়ীরা বকেয়া পাওনাগণ্ডা আদায় করে নিতেন। মিঠাই-মন্ডা কিছু বিতরণ করা হলেও ব্যাপারটা সবার জন্য সুখবর ছিল, এমন মনে হয় না। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার বোধ করছি, হালে দেখছি অনেকেই শৈশবে দেখা বৈশাখী মেলায় উল্লেখ করে থাকেন। কথাটি ঠিক নয়। বৈশাখী মেলা বলে কিছু প্রচলিত ছিল না। ছিল চৈত্রসংক্রান্তি মেলা। আধুনিক বৈশাখী মেলার সঙ্গে চৈত্রসংক্রান্তির স্মৃতি গুলিয়ে ফেলার ফলেই এ বিভ্রান্তি। যাক, ফিরে আসি পহেলা বৈশাখ উদযাপন প্রসঙ্গে।

উনিশ শতকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু তরুণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকশিত হতে শুরু করে। তাদেরই একজন কবি মাইকেল মধুসূদনের বন্ধু হিসেবে বহুলভাবে পরিচিত রাজ নারায়ণ বসু (অন্য পরিচয়ে তিনি ঋষি অরবিন্দ ও বিপ্লবী বারীন্দ্র ঘোষের দাদু)। রাজ নারায়ণ পেশায় ছিলেন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সে সময় এ দেশে ইংরেজ শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত। আর ইংরেজি প্রথায় পহেলা জানুয়ারি নববর্ষ উদযাপনেরও ব্যাপক প্রসার ঘটে গেছে। অন্তত শিক্ষিত মহলে। রাজ নারায়ণ বসু ব্যাপারটি লক্ষ্য করলেন। তার বিদ্যালয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মাধ্যম বাংলা নববর্ষকে সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। শান্তি নিকেতনসহ শিক্ষাঙ্গনে তার কিছু প্রভাব পড়লেও এ উদযাপনকে ব্যাপক প্রসারের জন্য অপেক্ষা করতে হয় আরও বেশ দীর্ঘকাল। যার মূলে আছে বাংলাদেশে জাতীয়তা বা স্বাতন্ত্রবোধের উন্মেষ।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের মানুষকে, বিশেষ করে বুদ্ধিজীবীদের স্বকীয়তা সন্ধানী করে তোলে। এভাবেই নজর পড়ে নিজেদের নববর্ষ পহেলা বৈশাখের প্রতি। যদ্দুর মনে পড়ে ১৯৬৪ সালে কবি জাহানারা আরজুর র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটের বাসায় নতুন আঙ্গিকে বেশ ঘটা করে পালিত হয় বাংলা নববর্ষ। এ অনুষ্ঠানে প্রয়াত কবি হাসান হাফিজুর রহমান পহেলা বৈশাখের ওপর একটি চমৎকার প্রবন্ধ পাঠ করেন। (যা পরে তার ’মূল্যবোধের জন্য’ নামক প্রবন্ধ সংকলনে গ্রন্থিত হয়)। আর গানে অংশ নেন ছায়ানটের শিল্পীরা। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ আয়োজনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন প্রয়াত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সঙ্গীত অন্তপ্রাণ সাংবাদিক ওয়াহিদুল হক। এটি ছিল একটি সান্ধ্য অনুষ্ঠান।

এ জনপদে প্রচলিত তিন বর্ষ গণনা পদ্ধতির সূচনালগ্ন কিন্তু ভিন্ন। যেমন চন্দ্র বছর হিজরি সনের গণনা শুরু হয় নতুন চাঁদের উদয় বা সূর্যাস্ত থেকে। ইংরেজি (গ্রেগরীয়) বর্ষের শুরু মধ্য রাতে। বঙ্গাব্ধ সৌর রীতির অনুসারী। ফলে বছর বা দিনের শুরু ধরা হয় সূর্যোদয় থেকে। র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটের সান্ধ্য উদযাপনের পর ঢাকায় পহেলা বৈশাখ উদযাপনের দায়িত্ব নিয়ে নেন সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের কর্মীরা। সূচনালগ্নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ছায়ানট তাদের রমনা বটমূলের আয়োজন নিয়ে আসেন প্রভাতে। অনুষ্ঠানটি সব শ্রেণীর মানুষের কাছে প্রাণপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে স্বাধীনতার পর পহেলা বৈশাখ সকালে নববর্ষ উদযাপন এই নগরীর পাড়ায় পাড়ায়ই নয় কেবল, বলতে গেলে গোটা দেশে ছড়িয়ে যায়। আমাদের মাটি ও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা আর স্বাধীনতা শত্রুমুক্ত কখনও ছিল না। এ দেশে ঘাপটিমারা শত্রুরা নানা পরিবর্তনের অবকাশে মাথা তোলার সুযোগ করে নেয়। স্বকীয়তার অন্যতম অবলম্বন নববর্ষ উদযাপনও সঙ্গতভাবেই তাদের বিষনজরে পড়ে। বটতলার অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণে প্রাণহানির মতো শোচনীয় ঘটনার অবতারণায় তাই তাদের বাধেনি। কিন্তু যে অনুষ্ঠানের সঙ্গে রয়েছে সব শ্রেণীর মানুষের প্রাণের যোগ বোমা ফাটিয়ে তা উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হওয়ার নয়। পহেলা বৈশাখ নতুন করে এ সত্যই আবার প্রমাণ করেছে।

নববর্ষ উদযাপন উদ্দীপনায় আজ একুশের পাশাপাশি গ্রামকে হিসাবে নিলে হয়তো একুশের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশে উৎসবের সঙ্গে মেলার যোগ সনাতনকাল থেকেই চলে আসছে। নববর্ষ উদযাপনের কর্মকান্ডে তাই অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছে বৈশাখী মেলা। যার ফলে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে আর্থ-সামাজিক জীবনের সম্পর্কও হয়ে উঠেছে ঘনিষ্ঠতর। আর এমনটাই কাম্য। আত্নিক আর বৈষয়িক ঋদ্ধির সংযোগই পারে সাংস্কৃতিক বিকাশের ভিত পাকা করতে।

আগেই বলেছি, আজকের নববর্ষ উদযাপনের উৎস খুঁজতে হলে একুশের চেতনার দ্বারস্থ হওয়ার গত্যন্তর নেই। সঙ্গতভাবেই তাই বলা যায় এর যোগ আমাদের অস্বিত্বের সঙ্গে। অন্যদিকে হিজরির যোগ বিশ্বাসের সঙ্গে হলে ইংরেজি বছরের যোগ দৈনন্দিন বৈষয়িকতায় আর বাংলা সনের সম্পর্ক অনুভূতির গভীরে প্রোথিত। আমাদের ঋতু-প্রকৃতির পরশ পাই বাংলা মাস আর দিনে। এই নববর্ষের আবেদন তাই কোনোদিন ক্ষুণ্ন হওয়ার নয়।

লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ

আমারবাঙলা/ইউকে

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

মদনে রাতের আঁধারে যুবককে কুপিয়ে টাকা লুট ‎

নেত্রকোনার মদনে এক যুবককে রাতের আঁধারে কুপিয়ে আহত করে মোবাইল সেট ও লক্ষাধিক ট...

উন্মুক্ত থাকবে জলাশয়, নিশ্চিত হবে জেলেদের অধিকার

হাওরাঞ্চলের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার...

লামায় গভীর রাতে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন: ২টি শ্যালো মেশিন ও পাইপ জব্দ

পার্বত্য জেলার বান্দরবানের লামা উপজেলায় গভীর রাতে মাতামুহুরী নদী থেকে...

মনোহরদীতে মোবাইল কোর্ট, যুবকের জেল

ইউনিয়নের ড্রেনেরঘাট এলাকায় রাতের অভিযানে মোবাইল পরিচালনা করে ইয়াবা সেবনের...

খামেনির জানাজা : বাংলাদেশের পক্ষে শ্রদ্ধা জানালেন স্পিকার

তেহরানে ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জন্য আয়োজিত রাষ্ট্র...

ধলঘাট-আহলা মিলন সংঘের দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটি গঠন

শ্রীশ্রী সার্বজনীন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বোয়ালখালী উপজেলার ধলঘাট-...

মদনে রাতের আঁধারে যুবককে কুপিয়ে টাকা লুট ‎

নেত্রকোনার মদনে এক যুবককে রাতের আঁধারে কুপিয়ে আহত করে মোবাইল সেট ও লক্ষাধিক ট...

হাতিয়ার সঙ্গে সারাদেশের নৌ-যোগাযোগ বন্ধ

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সঙ্গে সারা দে...

এখনই হচ্ছে না পে-স্কেলের গেজেট

চলতি জুলাই মাসে প্রকাশ হচ্ছে না সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো...

দেশে ঢোকানো হচ্ছে বিষাক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণী

সম্প্রতি ঢাকায় মিরপুরে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে সংরক্ষণ ও বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা