কয়েক মাসের গোপন পরিকল্পনা ও নিবিড় গোয়েন্দা নজরদারির পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সমন্বিত অভিযান পরিচালিত হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।প্রত্যাশিতভাবে গভীর রাতে নয়, বরং শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে একটি কম্পাউন্ডে হামলাটি চালানো হয়, যা ছিল তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া কৌশলগত সিদ্ধান্ত।
রোববার (১ মার্চ) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরে এমন একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন, যখন ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব একসঙ্গে অবস্থান করবেন। শনিবার সকালে খামেনি একটি নির্দিষ্ট কম্পাউন্ডে উপস্থিত থাকবেন এমন গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য কয়েক ঘণ্টা আগেই তাদের হাতে আসে। একই সময়ে সেখানে আরও জ্যেষ্ঠ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উপস্থিতির তথ্যও নিশ্চিত করা হয়।
গোয়েন্দা তথ্যের উৎস হিসেবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা যায়, তথ্যটি সরবরাহ করে সিআইএ, তবে সরাসরি হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে দুই দেশের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের ইঙ্গিত মিলেছে। ইসরায়েল নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলায় মনোযোগ দেয়, আর যুক্তরাষ্ট্র সামরিক স্থাপনাগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইঙ্গিত দেন, উন্নত গোয়েন্দা ও নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমেই খামেনির অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তিনি লেখেন, তিনি আমাদের গোয়েন্দা ও অত্যন্ত উন্নত ট্র্যাকিং ব্যবস্থার নজর এড়াতে পারেননি।
গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল। তখন টেলিযোগাযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে ব্যক্তিদের চলাচল শনাক্ত করার কৌশল ব্যবহারের খবরও প্রকাশিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এমন নজরদারি ‘প্যাটার্ন অব লাইফ’ তৈরি করতে সহায়তা করে, যা লক্ষ্যবস্তুর দুর্বল মুহূর্ত চিহ্নিত করতে কার্যকর।
শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান কম্পাউন্ডটিতে প্রায় ৩০টি বোমা নিক্ষেপ করে বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, খামেনি নিরাপত্তার জন্য ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে অবস্থান করছিলেন, ফলে গভীর পর্যন্ত আঘাত হানতে একাধিক শক্তিশালী গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়। তেহরানে পৌঁছাতে ইসরায়েলি জেটের প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে, যদিও তারা কত দূর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে তা স্পষ্ট নয়।
ইরান সরকার তিনজন জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ডিফেন্স কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী শামখানি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ নাসিরজাদেহ এবং আইআরজিসি কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর। একই সময়ে তেহরানের আরও কয়েকটি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়, যার মধ্যে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের কার্যালয়ও ছিল। পরে তিনি বিবৃতিতে জানান, তিনি নিরাপদ আছেন।
হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লোরিডার মার এ লাগোতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন বলে জানা গেছে। খামেনির মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পেতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এদিকে, সম্ভাব্য উত্তরাধিকারের পরিকল্পনা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। শুধু খামেনি নয়, অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও বিকল্প নেতৃত্বের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল।
আমারবাঙলা/এসএবি