সংগৃহীত
মতামত
ইঙ্গ-মার্কিন শক্তির শত বছরের প্রকল্প!

ফিলিস্তিন – ইসরায়েল যুদ্ধ বিরতিতে ব্লিঙ্কেনের “না”

এম এম রুহুল আমীন: গত শনিবার আরব নেতারা আম্মানে ফিলিস্তিন – ইসরায়েল যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব দেন। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্টনি ব্লিঙ্কেন যোগ দেন এবং আরব নেতাদের প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন – ইসরায়েল যুদ্ধ বিরতি প্রত্যাখান করেন।

ব্লিঙ্কেনের মতে যুদ্ধ বিরতির ফলে হামাস নিরাপদ স্থানে সরে গিয়ে আবার সংগঠিত হবে এবং পুনরায় ইসরায়েলে আঘাত হানবে। অপর দিকে আরব নেতাদের মতে মানবিক দিক বিবেচনায় বেসামরিক নাগরিক, বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা বিধানই যুদ্ধ বিরতির মূল উদ্দেশ্য। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আমেরিকার পডকাস্টে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন “ বাইরে থেকে যে যাই বলুক না কেন, বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। হামাস যা করেছে তার কোন যুক্তি নেই। আবার ইসরায়েল এখন যা করে চলেছে তাও অগ্রহণযোগ্য । এবং এটাও সত্য যে, গাজায় অনেক ফিলিস্তিনি মারা যাচ্ছে যাদের সাথে হামাসের কার্যক্রমের কোন যোগ সূত্র নেই।”

আরব জাতিসমুহের অন্তরে যাই থাকুক না কেন বর্তমানে তারা প্রকাশ্যে ফিলিস্তিন–ইসরায়েল যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান চায়। সম্প্রতি কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী “ফিলিস্তিন – ইসরায়েল সংঘাতের অবসান কি আদৌ সম্ভব ? এমন এক প্রশ্নের জবাবে যেমন বলেছেন “অবশ্যই সম্ভব করতে হবে।” কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান বিন জাসিম আল থানির মন্তব্যের সাথে একমত পোষন করে জর্ডান, সৌদি আরব, মিশর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুধুমাত্র হামাস পূন:গঠিত হতে পারে এমন এক যুক্তিতে কমপক্ষে ১০ হাজার ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক, বৃদ্ধ, নারী ও শিশু নিহত হওয়াকে ভ্রক্ষেপ করছেন। এমনকি হামাসের অযৌক্তিক হামলায় ১৫০০ ইসরায়েলের নাগরিক নিহত হওয়াকে ১০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহতের চেয়েও বেশী গুরুত্বর্পূ্ণ মনে করছেন। ধারণা করা হচ্ছে যে, ইসরায়েল তার ১৫০০ নাগরিকের হত্যার বদলে সমস্ত গাজাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে চাইছে। ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাজ্যের পরে যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র তৃতীয় দেশ যারা ফিলিস্তিন–ইসরায়েল যুদ্ধ অবসানের বিপক্ষে একক শক্তিশালী পক্ষ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের প্রয়োজনে দুর্লভ বোমা তৈরির উপকরণ কৃত্রিম ফসফরাস তৈরি করতে সক্ষম হন ইহুদি বিজ্ঞানী ড. হেইস বাইজম্যান ৷ ফলে আনন্দিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন কী ধরনের পুরস্কার তিনি চান? উত্তর ছিল- "অর্থ নয়, আমার স্বজাতির জন্য এক টুকরো ভূমি আর তা হবে ফিলিস্তিন ৷ ফলে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডটি ইহুদিদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয় ব্রিটেন৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ জয়ের পর ব্রিটেন স্বাধীনতা দেয়ার অঙ্গীকারে ১৯১৮ সাল থেকে ৩০ বছর দেশটিকে নিজেদের অধীন রাখে ৷ মূলত এই সময়টিই ফিলিস্তিনকে আরব-শূন্য (বিশেষত মুসলিম-শূন্য) করার জন্য কাজে লাগায় ইঙ্গ-মার্কিন শক্তি ৷

১৯২০ সালে জাতিসংঘ ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশরা ম্যান্ডেটরি প্যালেস্টাইন প্রতিষ্ঠা করে। ব্রিটিশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দলে দলে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে জড়ো হতে থাকে, যাকে আলিয়াহ বলা হয়। অতঃপর ব্রিটিশ সরকার একদিকে ইহুদিদের জন্য ফিলিস্তিন উন্মুক্ত করে দেয়, অন্যদিকে ব্রিটিশ বাহিনীর সহযোগিতায় ইহুদি মিলিশিয়ারা ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য গড়ে তুলতে থাকে বিভিন্ন সংগঠন। তার মধ্যে তিনটি প্রধান সংগঠন ছিল হাগানাহ, ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং; যারা হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ আর ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টির মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদেরকে ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করে। সংগঠনগুলোর গণহত্যার কথা যখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত হচ্ছিল তখন পরিস্থিতকে নিজেদের অনুকূলে আনার জন্য গুপ্ত সংগঠন হাগানাহ বেছে নেয় আত্মহনন পন্থা ৷

১৯৪০ সালে এসএস প্যাট্রিয়া নামক একটি জাহাজকে হাইফা বন্দরে তারা উড়িয়ে দিয়ে ২৭৬ জন ইহুদিকে হত্যা করে ৷ ১৯৪২ সালে আরেকটি জাহাজকে উড়িয়ে দিয়ে ৭৬৯ জন ইহুদিকে হত্যা করে ৷ উভয় জাহাজে করে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে আসছিল আর ব্রিটিশরা সামরিক কৌশলগত কারণে জাহাজ দুটিকে ফিলিস্তিনের বন্দরে ভিড়তে দিচ্ছিল না ৷ হাগানাহ এভাবে ইহুদিদের হত্যা করে বিশ্ব জনমতকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করে ৷ পাশাপাশি ইহুদিদের বসতি স্থাপন ও আরবদের উচ্ছেদকরণ চলতে থাকে খুব দ্রুত ৷ এর ফলে ২০ লাখ বসতির মধ্যে বহিরাগত ইহুদির সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ৫ লাখ ৪০ হাজার ৷ এ সময়ই ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইঙ্গ-মার্কিন চাপে জাতিসংঘে ভোট গ্রহণ করা হয়, তাতে ৩৩টি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে, ১৩টি বিপক্ষে এবং ১০টি ভোট প্রদানে বিরত থাকে ৷

প্রস্তাব অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ হয়েও ইহুদিরা পেল ভূমির ৫৭% আর ফিলিস্তিনিরা পেল ৪৩% তবে প্রস্তাবিত ইহুদি রাষ্ট্রটির উত্তর-পশ্চিম সীমানা ছিল অনির্ধারিত ফলে ভবিষ্যতে ইহুদিরা সীমানা বাড়াতে পারে৷ এভাবে ইহুদিদের কাঙ্ক্ষিত ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত হয়ে পড়ে।

ফিলিস্তিন অঞ্চলের কার্যত মালিকানা লাভের পর ইহুদি বসতি বাড়ানোর লক্ষ্যে এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করার উদ্দেশে রাতে তাদের ফোন লাইন, বিদ্যুৎ লাইন কাটা, বাড়িঘরে হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, জোর করে জমি দখল এবং বিভিন্নভাবে নারী নির্যাতনের মতো কাজে জড়িয়ে পড়লো স্থানীয় ও বহিরাগত ইহুদি ও সরকারের মদদপুষ্ট সেনাবাহিনী৷ ফলে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি আরব দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

এরপরই ১৯৪৮ সালের ১২ মে রাত ১২টা এক মিনিটে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করে ইহুদি জায়নবাদীরা, যাদের প্রধান ছিলেন দাভিদ বেন গুরিয়ন (পরবর্তীতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী) ৷ ১০ মিনিটের ভেতর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, অতঃপর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ব্রিটেন স্বীকৃতি দেয়।

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক আমার বাঙলা

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

পর্যটন বিকাশে সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জরুরি: মীর হেলাল উদ্দিন

পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় ও অংশীদা...

পুতিনের দল ইউনাইটেড রাশিয়ার জয়জয়কার

রাশিয়ার সংসদীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিম...

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণ ঘিরে নিউইয়র্কে ব্যাপক কৌতূহল

জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য ঘিরে নিউইয়র্কজুড়ে...

তাপমাত্রা পৌঁছেছে ৩৭.৫ ডিগ্রিতে

এক দিনের বিরতির পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবারও তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। আজ সোমবা...

মিয়ানমারের সঙ্গে ড্র করে এশিয়ান গেমস শেষ করল বাংলাদেশ

এশিয়ান গেমসে হারের বৃত্ত থেকে অবশেষে বের হয়ে এল বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। গ্র...

মার্শাল আর্টে ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত করলেন জিন্নাত

এশিয়ান গেমসের উশু (মার্শাল আর্ট) ডিসিপ্লিনে বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এক নতু...

নতুন জোট পি৪এমের উদ্বোধনে যোগ দিচ্ছে ভারত

বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর রাজনীতির বাইরে গিয়ে জাতিসংঘের বহুপাক্ষিকতা নীতিকে সমর্...

জাপানের কাছে হেরে কাবাডিতে বড় ধাক্কা বাংলাদেশের

এশিয়ান গেমস কাবাডিতে জাপানের বিপক্ষে ৪০–৩৭ পয়েন্টের ব্যবধানে হেরে পদক...

লংমার্চের সিদ্ধান্তে অটল পাকিস্তানের জামায়াত-ই-ইসলামী

সরকারের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে সময় দিলেও প্রতি...

বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী: মাহ্দী আমিন 

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা