মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় নদী শাসন আইন না মেনে অবাধে মনু নদীর তলদেশ খনন করে বালু উত্তোলনের কারণে একের পর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটছে। উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নে মনু নদীর কটারকোনা সেতুর পাশ থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন ও ট্রলার দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট গভীর গর্তে ডুবে নাঈম হোসেন (১৭) নামে এক মাদরাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। গত শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকালে কটারকোনা সেতু এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে অবাধে বালু উত্তোলনের কারণে চরম হুমকির মুখে রয়েছে মনু নদীর কটারকোনা সেতু।
খবর পেয়ে শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দিনব্যাপী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনিসুল ইসলামের নেতৃত্বে কটারকোনা সেতু এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। অভিযানে কুলাউড়া থানা পুলিশ সহযোগিতা করে। এ সময় বালুমহালের ইজারাদারের ৫টি ড্রেজার মেশিন, ২টি ট্রলারসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি জব্দ করে স্থানীয় হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর আহমদ চৌধুরী বুলবুলের জিম্মায় রাখা হয়।
এর আগে প্রশাসনের কয়েক দফা অভিযানে বালুমহালের বর্তমান ইজারাদার নাজমুন নাহার লিপিকে প্রায় ৪ লাখ টাকা জরিমানা করে উপজেলা প্রশাসন।
স্থানীয় লোকজন জানান, এক সপ্তাহ আগে কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর নোয়াগাঁও তালিমুল কোরআন মাদরাসার ১৪ জন শিক্ষার্থী কুলাউড়া উপজেলার মনু কটারকোনা কওমি মাদরাসায় বেফাক বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে আসে। শুক্রবার সকালে তিন বন্ধুর সঙ্গে কটারকোনা সেতু এলাকায় মনু নদীতে গোসল করতে গিয়ে বিশাল গর্তে ডুবে নিখোঁজ হয় নাঈমসহ তার সহযোগীরা। পরে মাদরাসায় খবর দেওয়া হলে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় লোকজন প্রায় দুই ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে তিনজন শিক্ষার্থীকে জীবিত উদ্ধার করলেও নাঈমকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
নিহত নাঈম কমলগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের উত্তর কানাইদেশী এলাকার হোসেন আলির ছেলে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মনু নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন বর্তমান ইজারাদার নাজমুন নাহার লিপি ও তার সহযোগী দীপক দে। ফলে হাজীপুর ও টিলাগাঁও ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ব্রাহ্মণবাজার–শমশেরনগর সড়কে মনু নদীর ওপর নির্মিত কটারকোনা সেতু চরম হুমকির মুখে পড়েছে। সেতুর পাশের পিলারের চারপাশের বালু ও মাটি সরে গিয়ে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে সেতু রক্ষার দাবিতে এলাকাবাসী মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা এবং জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি প্রদান করে আসছেন। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় একটি মহলের সহযোগিতায় ইজারাদার গং নদীর তলদেশ ৪০-৫০ ফুট গভীর করে খনন করে রমরমা বালুর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে নদীর বুকে মৃত্যুকূপের মতো গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রতি বছরই এখানে দুর্ঘটনা ঘটে। ২০২২ সালে বনভোজনে এসে এক শিক্ষার্থী, ২০২৩ সালে এক পথচারী, ২০১০ সালে কটারকোনা এলাকার বাসিন্দা আনুছ মিয়ার ছেলে লাদিন হোসেন (৮), এবং ২০১১ সালে একই গ্রামের মৃত আছন আলীর ছেলে মারজান আহমদ (১২) মনু নদীর গভীর গর্তে ডুবে মারা যায়।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরে মনু নদীর বালুমহাল ইজারা নেন হবিগঞ্জের যুবলীগ নেতা সেলিম আহমদের স্ত্রী নাজমুন নাহার লিপি। অথচ ইজারা নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, নদীর ওপর নির্মিত ব্রিজের উভয় পাশে এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন করা যাবে না। কিন্তু এই শর্ত ভঙ্গ করে কটারকোনা সেতুর পাশ থেকেই ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে ইজারাদারের ব্যবসায়িক সহযোগী দীপক দে বলেন, নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে সরকারি নিয়ম মেনে বালু উত্তোলন করা হবে।
হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি অবৈধ বালু উত্তোলনের সরাসরি ফল। বহুবার প্রশাসনকে জানানো হলেও কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।”
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনিসুল ইসলাম বলেন, “মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে ইজারাদারের ড্রেজার মেশিন ও ট্রলার জব্দ করা হয়েছে এবং অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগেও ইজারা চুক্তি ভঙ্গের দায়ে তাকে জরিমানা করা হয়েছিল। জনস্বার্থে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, “শিক্ষার্থী মৃত্যুর বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে। কটারকোনা সেতু ও স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে মনু বালুমহালের ইজারা বাতিলের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।”
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, “মনু নদীতে গর্তে ডুবে শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি তদন্ত করে কটারকোনা সেতু রক্ষা ও স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আমারবাঙলা/এসএবি