জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন ঘিরে অনলাইনে নেতিবাচক প্রচারণা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপ থেকে নারী প্রার্থীদের টার্গেট করে ধারাবাহিকভাবে বুলিং, ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য, অপপ্রচার ও চরিত্রহননমূলক কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে ২৫টি কেন্দ্রীয় পদ এবং ছাত্রী হলগুলোর ১৫০টি পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। কিন্তু আশঙ্কাজনক বিষয় হলো- নির্বাচনে ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হলেও প্রার্থী হিসেবে তাদের উপস্থিতি খুবই সীমিত। অনেক ছাত্রী হলের সংরক্ষিত আসন ফাঁকা পড়ে আছে; শূন্য পদের সংখ্যা ৫৬। বিশেষ করে ভিপি সহ কেন্দ্রীয় সংসদের চারটি পদে কোনো নারী প্রার্থীই নেই।
অংশগ্রহণে পিছিয়ে পড়া নিয়ে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শ্রাবণী জামান জ্যোতি বলেন, আন্দোলনে ছাত্রীরা যে অবদান রেখেছিল, তার স্বীকৃতি মেলেনি। বরং পরবর্তীতে অনলাইনে অপমানজনক ট্রল, স্লাট শেমিং বেড়েছে। সবাই এ চাপ নিতে পারে না, তাই অনেকে প্রার্থী হতে চায়নি।"
জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ফাইজা মেহজাবিন বলেন, নারীবান্ধব পরিবেশের অভাব স্পষ্ট। প্রশাসনকে বারবার অভিযোগ জানালেও ফেসবুক পেজগুলো বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ সমর্থিত 'শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম' থেকে এজিএস প্রার্থী মালিহা নামলাহ জানান, তফসিল ঘোষণার পর থেকেই আমাকে কয়েকটি পেজে অপমানজনক পোস্টে টার্গেট করা হচ্ছে। প্রচারণা শুরু হলে এই হামলা আরও বেড়ে যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে পরিচালিত 'জেইউ আপডেট', 'জাবিয়ান সুশীল সমাজ', 'জেইউ ইনসাইডার্স', 'জাকসু নিউজ', 'জেইউ সার্কাজম', 'জেইউ ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন' সহ অন্তত ১০টির বেশি পেজ ও গ্রুপে নির্বাচনী পরিবেশকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে। প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন, এগুলো রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত একটি চক্র পরিচালনা করছে, যার উদ্দেশ্য নারীদের রাজনীতির ময়দান থেকে দূরে রাখা।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, ছাত্রীদের পোশাক নিয়ে কটূক্তি, স্লাট শেমিং, চরিত্র হনন-এসবই সাইবার বুলিংয়ের রূপ। এতে অনেকেই অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
ডিজিটাল মিডিয়া গবেষক ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সাঈদ আল-জামান মনে করেন, বট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এ ধরনের আক্রমণ জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও জনমত প্রভাবিত করতে পারে। দ্বিধাগ্রস্ত ভোটারদের বিভ্রান্ত করা হবে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।
এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সাইবার ইউনিটকে অবহিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত অনুরোধ পাঠাবে বলে জানানো হয়েছে।
এছাড়া, অনলাইন বুলিংকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের আওতায় আনার জন্য ছাত্র-শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ ২০১৮ সংশোধনে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদ বলেন, "আমরা চাই নির্বাচনী পরিবেশ যেন নষ্ট না হয়। যারা অপপ্রচারে জড়িত, তাদের শনাক্ত করে শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই সাইবার আক্রমণ কেবল ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ নয়, জাতীয় নির্বাচনেও একইভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত করে দেওয়ার পাশাপাশি জনমতকে বিপথগামী করার বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে এই সাইবার বুলিং।
আমারবাঙলা/এফএইচ