ছবি: সংগৃহীত
মতামত

নির্বাচন, সহিংসতা ও নারী: আমরা কোন পথে হাঁটছি?

আরিয়ান রহমান আকাশ

নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র অনুষঙ্গ। এটি কেবল ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নয়; বরং জনগণের মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক সম্মিলিত সুযোগ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, গত কয়েকদিনে বাংলাদেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে মারামারি, হামলা, সহিংসতা, নারীদের হেনস্তা এবং নারীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্যের ঘটনা ঘটেছে, তা আমাদের গণতান্ত্রিক চেতনা ও সামাজিক মূল্যবোধকে গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

রাজনৈতিক মতভেদ নতুন কিছু নয়। ইতিহাসজুড়েই ক্ষমতার লড়াই হয়েছে, আদর্শের সংঘাত হয়েছে। কিন্তু সেই মতভেদ যখন রাস্তায় রক্ত ঝরায়, যখন ভোটকেন্দ্র যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নেয়, আর যখন নারীর শরীর ও মর্যাদা রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় তখন তা আর রাজনীতি থাকে না, তা পরিণত হয় সভ্যতার বিরুদ্ধে এক নগ্ন আগ্রাসনে।

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো নারীদের ওপর ঘটে যাওয়া হেনস্তা ও সামাজিক মাধ্যমে বা প্রকাশ্য সভা–সমাবেশে নারীদের নিয়ে করা অশালীন মন্তব্য। নারী এখানে কেবল একজন নাগরিক নন, তিনি মা, বোন, কন্যা, সহকর্মী এবং সর্বোপরি তিনি একজন মানুষ। অথচ নির্বাচন এলেই কেন নারীর মর্যাদা সবচেয়ে সস্তা হয়ে যায়? কেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আঘাত করতে গিয়ে প্রথম আঘাতটি গিয়ে লাগে নারীর সম্মান ও ব্যক্তিসত্তায়?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সমাজের গভীরে তাকাতে হবে। আমরা মুখে মুখে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলি, আন্তর্জাতিক দিবস পালন করি, উন্নয়নের গল্প করি। কিন্তু বাস্তবে যখন রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ে, তখনই দেখা যায় পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার আসল চেহারা। তখন নারীকে আর সহযোদ্ধা হিসেবে দেখা হয় না, দেখা হয় অপমানের সহজ মাধ্যম হিসেবে। এটি শুধু নারীর বিরুদ্ধে নয়, এটি মানবিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ অপরাধ।

আরেকটি দিক হলো সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ। নির্বাচন মানেই যেন ভাঙচুর, আগুন, লাঠিচার্জ, পাল্টাপাল্টি হামলা এমন একটি ধারণা আমাদের সমাজে গেঁথে গেছে। তরুণরা বড় হচ্ছে এই দৃশ্য দেখে, শিশুরা শিখছে যে মতের অমিল মানেই শক্তি প্রয়োগ। রাজনীতির ময়দানে ক্ষমতায় যেতে হলে পেশি শক্তির প্রয়োগ করতে হবে। এর ফল কী হবে? আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা যুক্তির বদলে ঘুষি, মতের বদলে মারধরকে বেছে নেবে?

এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানে বড় দুই দল বিএনপি বা জামায়াত অথবা অন্য যেসকল দল রয়েছে, তাদের দায় আছে নিজেদের কর্মী–সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে রাখা, সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া এবং প্রকাশ্যে নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের নিন্দা করা। কিন্তু যখন নারীদেরকে কেউ বেশশ্যা বলে মন্তব্য করেছেন আবার কেউ কাপর খুলে নেওয়ার কথা বলছেন তখন দুঃখজনকভাবে,আমরা দেখি নীরবতা। দলের উচ্চ পর্যায় থেকে কর্মীদের এই বিষয়ে সতর্ক করছেন কিংবা তাদেরকে দল থেকে বহিস্কার ও শাস্তির মুখোমুখি দাড় করানো হয়েছে এমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর এই নীরবতাই হয়েতো এই ধরণের অপরাধকে উৎসাহ দেয়।

রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন সবার কাছেই জনগণের প্রত্যাশা ছিল তারা নির্বাচনকে নিরাপদ ও সম্মানজনক করবে। কোথাও কোথাও তারা সফল হয়েছে, আবার কোথাও ব্যর্থতার চিত্রও স্পষ্ট। বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের গাফিলতি ক্ষমার অযোগ্য।

মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের গণমাধ্যম বলতে গত দেড় দশকে দেখেছি একটা দলের বা সরকারের গোলামী করতে। কিন্তু ৫ই আগস্টের পরে আশা দেখিছিলাম মিডিয়া হয়তো সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার ক্ষেত্রে তারা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। তবে সেই আশা এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। গণমাধ্যমের ভূমিকা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ, কোন একটা দিকে তারা মনোযোগ আকর্ষণ করছেন। নারীর প্রশ্নে মিডিয়া কিছুটা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলেও সেটা আবার কোন রাজনৈতিক দলের নারী কর্মী-তার উপর নির্ভর করে সংবাদ গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে সামাজিক মাধ্যমে অবাধে ছড়িয়ে পড়ছে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, গুজব ও বিদ্বেষ, কারণ এখানে যে যার মতো করে পারছে নারীকে নিয়ে এমন কোন নোংরা শব্দ নাই যা ব্যবহার করছেন না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই স্বাধীনতা যদি অন্যের মর্যাদা হরণের হাতিয়ার হয়, তবে সেখানে লাগাম টানার নৈতিক দায় সমাজেরই।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন আসে আমরা কী চাই? আমরা কি কেবল ক্ষমতার পালাবদল চাই, নাকি একটি সুস্থ, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ গণতন্ত্র চাই? যদি দ্বিতীয়টি চাই, তবে আমাদের প্রত্যেককে আত্মসমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বলতে হবে সহিংসতা নয়, নারী অবমাননা নয়, অশালীনতা নয়। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পর্যন্ত সর্বত্র নৈতিকতা ও সহনশীলতার চর্চা জরুরি। পরিবারে, বিদ্যালয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সবখানেই শেখাতে হবে যে ভিন্নমত শত্রুতা নয়। আর নারী কোনো দলের সম্পত্তি নয়, কোনো অস্ত্র নয়; তিনি সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক।

সবশেষে বলব, নির্বাচন শেষ হয়ে যাবে, সরকার আসবে–যাবে। কিন্তু যে ক্ষত সমাজে তৈরি হচ্ছে বিশেষ করে নারীর মনে যে ভয় ও অপমানের বোধ জন্ম নিচ্ছে তা সহজে সারে না। সেই ক্ষত সারানোর দায় আমাদের সবার। নইলে ইতিহাস একদিন আমাদের প্রশ্ন করবে গণতন্ত্রের নামে আমরা কীসের চর্চা করেছিলাম?

লেখক: শিক্ষার্থী, মার্সিন ইউনিভার্সিটি,তুরস্ক।

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

তুলা-স্যাভলনে ছোঁয়ায় ৫০০ টাকা! রেডিক্যাল হাসপাতালে ‘পকেটমারি’

রাজধানীর উত্তরা এলাকায় বেসরকারি চিকিৎসাসেবার অরাজকতা যেন দিন দিন আরও ভয়াবহ রূ...

দৌলতপুরে তিন দিনব্যাপী কৃষি প্রযুক্তি মেলার উদ্বোধন

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আয়োজনে এবং যশোর অঞ্চলে ট...

কুষ্টিয়ায় বিএনপি প্রার্থীর মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা পণ্ড করলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট

কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক সাংসদ সৈয়দ ম...

পটুয়াখালী-৪ আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা ও নারী কর্মী হেনস্থার অভিযোগ ১০ দলীয় জোট প্রার্থীর

পটুয়াখালী-৪ (রাঙ্গাবালী–কলাপাড়া) আসনে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে বা...

পদত্যাগের ৫০ দিন পরও সরকারি বাসায় আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলম

গত বছরের ১০ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছ...

মৌলভীবাজারে পোস্টারবিহীন নির্বাচন, বেড়েছে স্বচ্ছতা

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পোস্টার ও ব্যানারবিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বা...

সিলেট ও মৌলভীবাজারে র‍্যাব-৯ এর অভিযানে ৯টি এয়ারগান উদ্ধার

সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্র ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে শুরু থেকেই অগ্রণী ভূমি...

শেরপুরে জামায়াত নেতাকে ইট দিয়ে থেঁতলে হত্যা করা হয়েছে: জেলা আমির

শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে ইট দিয়ে থে...

রাজশাহীতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই: তারেক রহমান

রাজশাহীতে আইটি পার্ক সচল করে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণদের দক্ষ করে তোলা হবে বলে জান...

আগে ৭১ সালের জন্য মাফ চান তারপর ভোট চান:  বিএনপি মহাসচিব

আগে ৭১ সালের জন্য মাফ চান তারপর ভোট চান জামায়াতকে উদ্দেশ্য করে মির্জা ফখরুল ব...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা