ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ: আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আমাদের জীবনে আবারও আগমন করেছে পবিত্র মাহে রমজান ১৪৪৭ হিজরি। মুসলিম উম্মাহর জন্য এই মাস কেবল একটি সময়ের নাম নয়; বরং এটি আত্মার জাগরণ, নৈতিক সংশোধন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য সুযোগ। তাই গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় আমরা বলি— আহলান সাহলান ইয়া শাহরা রমজান, হে বরকতময় রমজান! তুমি আমাদের জীবনে স্বাগত।
রমজানের প্রতিটি দিন রহমতে ভরপুর, প্রতিটি রাত মাগফিরাতে সিক্ত এবং প্রতিটি মুহূর্ত নাজাতের সম্ভাবনায় আলোকিত। এই মাসেই মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ হিদায়াতগ্রন্থ আল-কুরআন নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন :- রমজান মাস, যে মাসে কুরআন নাজিল করা হয়েছে:- মানুষের জন্য পথনির্দেশ, হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে। (সুরা আল-বাকারা: ১৮৫)
রোজা: তাকওয়া অর্জনের ফরজ বিধান
রমজানের মূল ফরজ ইবাদত হলো রোজা। তবে রোজার উদ্দেশ্য কেবল ক্ষুধা ও পিপাসা সহ্য করা নয়; বরং তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:- হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।”
(সুরা আল-বাকারা: ১৮৩) তাকওয়া এমন একটি গুণ, যা মানুষকে প্রকাশ্য ও গোপনে গুনাহ থেকে বিরত রাখে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানায়। মাহে রমজান ১৪৪৭ হিজরি আমাদের সেই তাকওয়ার পথে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করার আহ্বান জানায়।
রোজা শুধু উপবাস নয়, চরিত্র গঠনের ইবাদত
রোজা মানুষের ভেতরের পশুত্বকে দমন করে এবং মানবিক গুণাবলিকে বিকশিত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:- রোজা একটি ঢাল।
তোমাদের কেউ যখন রোজা রাখে, সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। কেউ যদি তাকে গালি দেয় বা ঝগড়া করতে চায়, তবে সে বলবে—আমি রোজাদার।-(সহিহ বুখারি : ১৮৯৪; সহিহ মুসলিম : ১১৫১) এই হাদিস প্রমাণ করে, রোজার প্রকৃত শিক্ষা আচরণগত সংযমে নিহিত। যে রোজা মানুষকে মিথ্যা, পরনিন্দা ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে পারে না, সে রোজা তার পূর্ণ ফল দিতে ব্যর্থ হয়।
কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের মাস
রমজান হলো কুরআনের মাস। এ মাসে কুরআন তিলাওয়াত, অনুধাবন ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগের এক বিশেষ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সাহাবায়ে কেরাম রমজানে কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতেন। কুরআন কেবল তিলাওয়াতের গ্রন্থ নয়; এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা। রমজান সেই সত্যকে নতুন করে উপলব্ধি করার সময়।
তারাবি ও কিয়ামুল লাইল: গুনাহ মাফের সুবর্ণ সুযোগ
রমজানের রাতগুলো ইবাদতের জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। তারাবির নামাজ মুসলিম সমাজে এক অনন্য ঈমানি আবহ সৃষ্টি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:- যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় রমজানে রাতের নামাজ আদায় করবে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
(সহিহ বুখারি: ২০০৯; সহিহ মুসলিম: ৭৫৯) রাতের নীরবতায় আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে কুরআনের আয়াত শ্রবণ ও হৃদয়ে ধারণ করা ঈমানকে নবায়ন করে এবং আত্মাকে প্রশান্ত করে।
লাইলাতুল কদর: হাজার মাসের চেয়েও উত্তম
রমজানের সবচেয়ে মহিমান্বিত উপহার হলো লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তায়ালা বলেন—লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।”
(সুরা আল-কদর: ৩) রাসুলুল্লাহ (সা.( আমাদেরকে এই রাত অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়ে বলেন:- তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।(সহিহ বুখারি: ২০১৭; সহিহ মুসলিম : ১১৬৯)
এই এক রাতের ইবাদত ৮৩ বছরেরও বেশি সময়ের ইবাদতের সমান—এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অসীম অনুগ্রহ।
দান-সদকা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
রমজান সহমর্মিতা ও মানবিকতার মাস। ক্ষুধার কষ্ট উপলব্ধি করে একজন রোজাদার দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখে। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন:- রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল; আর রমজানে তাঁর দানশীলতা আরও বেড়ে যেত।-(সহিহ বুখারি: ৬) জাকাত, ফিতরা ও নফল সদকার মাধ্যমে সমাজে ভারসাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠিত হয়।
তওবা ও মাগফিরাতের মাস
রমজান হলো তওবা কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—যে ব্যক্তি রমজান পেল অথচ তার গুনাহ ক্ষমা করা হলো না, সে চরম দুর্ভাগা।”
(জামে তিরমিজি: ৩৫৪৫) এই হাদিস আমাদের সতর্ক করে:- রমজানকে অবহেলায় কাটানো মানে আল্লাহর রহমত থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা।
রমজান ১৪৪৭ হিজরি: জীবন বদলের আহ্বান
রমজান কোনো আনুষ্ঠানিক ইবাদতের নাম নয়; এটি জীবন বদলে দেওয়ার মাস। এই মাস আমাদের শেখায় সংযম, ইখলাস, সহমর্মিতা ও আল্লাহভীতি। যদি রমজান শেষে আমাদের আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিকতায় পরিবর্তন না আসে, তবে সেই রমজান আমাদের জীবনে কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারেনি।
পরিশেষে, আসুন, মাহে রমজান ১৪৪৭ হিজরিকে আমরা কেবল রোজা রাখার মাস হিসেবে নয়; বরং তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার আলোয় জীবন পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের সবাইকে এই বরকতময় মাসের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করে ইবাদত করার তাওফিক দান করেন এবং রমজানকে আমাদের নাজাতের সোপান বানিয়ে দেন—আমিন।
আসার বাঙলা/আরএ
লেখক, কলাম লেখক ও ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধকার
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামী গবেষণা সেন্টার।
ইমেইল, [email protected]