ছবি: সংগৃহীত
সারাদেশ

বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পাহাড়ের মাচাংঘর

উচ্চপ্রু মারমা রাজস্থলী, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

রাঙামাটির রাজস্থলী পার্বত্যাঞ্চলে একসময় পাহাড়ি গ্রামগুলোতে চোখে পড়ত সারি সারি উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁশ ও কাঠের তৈরি মাচাংঘর। প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে থাকা এসব ঘর ছিল শুধু বাসস্থান নয়, বরং পাহাড়ি সমাজের জীবনধারা, ঐতিহ্য ও সুরক্ষার প্রতীক। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, আধুনিকতার স্পর্শ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরের ঢেউয়ে এখন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী মাচাংঘর।

শত শত বছর ধরে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নিজেদের জীবনযাপনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে তৈরি করেছে মাচাংঘরের ধরণ। বাঁশ, কাঠ ও তক্তা দিয়ে গড়া এই ঘরগুলো পাহাড়ি ঢালের ওপর পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকত। বন্য প্রাণীর আক্রমণ, বর্ষার পানি ও কাদা থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি মাচাংঘর ছিল প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহের সুবিধাজনক আবাস।
গরমে ঠান্ডা ও শীতে উষ্ণ রাখার উপযোগী এই ঘরগুলো প্রকৃতির সঙ্গে পাহাড়ি মানুষের সহাবস্থানের প্রতীক ছিল।

রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা সাংউমে মারমা বলেন— “আমাদের ছোটবেলায় পুরো পাড়াজুড়ে মাচাংঘরের সারি দেখা যেত। এখন এক-দুটি ছাড়া আর কিছুই নেই। সবাই এখন পাকা ঘর বানাচ্ছে, যদিও মাচাংঘর ছিল অনেক বেশি ঠান্ডা, বাতাস চলাচলের সুবিধাজনক ও পরিবেশবান্ধব।”

শিক্ষার প্রসার, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাবে পাহাড়ি সমাজেও আধুনিক স্থাপত্যের ছোঁয়া লেগেছে। এখন অনেকেই পাকা ইট-সিমেন্টের ঘর নির্মাণে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
নতুন প্রজন্মের কাছে মাচাংঘর হয়তো অচল একটি ঐতিহ্য—কিন্তু পুরনো প্রজন্মের কাছে এটি স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

রাজস্থলী উপজেলা তরুণ সমাজকর্মী উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন—“মাচাংঘর কেবল কাঠের ঘর নয়, এটি ছিল আমাদের সংস্কৃতির হৃদস্পন্দন। অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে জুমের ধান ভাগাভাগি—সব কিছুই ঘটত মাচাংঘরে। এখন সেগুলো হারিয়ে গেলে আমাদের সংস্কৃতির একটা অধ্যায়ও হারাবে।”

রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আদোমং মারমা বলেন— “আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে মাচাংঘরের জীবনধারা তৈরি করেছিলেন। আধুনিকতার নামে সেই ঐতিহ্য হারানো কষ্টদায়ক। আমরা চাই, সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন মিলে কিছু মাচাংঘর সংরক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করুক। এতে আমাদের সংস্কৃতি বাঁচবে, আর পাহাড়ে পর্যটনও বাড়বে।”

তিনি আরও বলেন—“আজ যদি আমরা এই ঐতিহ্য রক্ষায় উদ্যোগ না নেই, তাহলে আগামী প্রজন্ম কেবল বইয়ের পাতায় বা ছবিতে মাচাংঘর দেখতে পাবে। তাই পাহাড়ি সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এখন সময়ের দাবি।”

একসময় পাহাড়ি গ্রামগুলোর ভোরবেলা বা গোধূলির আলোয় মাচাংঘরের সারি যেন একেকটি জীবন্ত চিত্রকর্মের মতো লাগত। ঘরের নিচে শুকাতে দেওয়া ধান, পাশে জুমের ঝুড়ি, শিশুদের হাসি—সব মিলিয়ে ছিল এক অপরূপ দৃশ্য। কিন্তু আজ সেই দৃশ্য প্রায় বিলীন। এখন পাহাড়ে জায়গা নিচ্ছে আধুনিক কংক্রিটের ঘর, হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের সুরেলা বন্ধন।

স্থানীয়রা মনে করেন, মাচাংঘর শুধু বাসস্থান নয়—এটি পাহাড়ি জাতিসত্তার পরিচয় ও ঐতিহ্যের বাহক। সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগে যদি কিছু মাচাংঘর সংরক্ষণ করে “ঐতিহ্য গ্রাম” বা “সংস্কৃতি সংরক্ষণ কেন্দ্র” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে এই ঐতিহ্য অন্তত আংশিকভাবে হলেও টিকে থাকবে।

উল্লেখ্য,,পাহাড়ের মাচাংঘর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই ঐতিহ্য বিলীন হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। এখনই যদি সংরক্ষণে উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে অচিরেই এই মাচাংঘর শুধুই বইয়ের পাতা আর স্মৃতিচারণায় সীমাবদ্ধ থাকবে।

আমারবাঙলা/এফএইচ

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

মদনে রাতের আঁধারে যুবককে কুপিয়ে টাকা লুট ‎

নেত্রকোনার মদনে এক যুবককে রাতের আঁধারে কুপিয়ে আহত করে মোবাইল সেট ও লক্ষাধিক ট...

মনোহরদীতে মোবাইল কোর্ট, যুবকের জেল

ইউনিয়নের ড্রেনেরঘাট এলাকায় রাতের অভিযানে মোবাইল পরিচালনা করে ইয়াবা সেবনের...

সেলাইয়ের সুতোয় হাজারো নতুন জীবন গেঁথেছেন নাসিমা

তিনি জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনট গ্রামের নাসিমা খানম। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদাই...

রোনো ইঞ্জিনে বাংলাদেশ রেল: বাড়ছে বিলম্ব ও দুর্ঘটনার শঙ্কা

বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যতম বড় সংকট এখন লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিনের ঘাটতি। কয়েক দশক ধরে...

দেশে ঢোকানো হচ্ছে বিষাক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণী

সম্প্রতি ঢাকায় মিরপুরে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে সংরক্ষণ ও বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখ...

চাচাতো বোনকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে মৃত্যুদন্ড

নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলায় আসমা আক্তার (৫) নামে এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে...

প্রধানমন্ত্রী বেতনের ১০ শতাংশ গরিবদের জন্য সরকারি কোষাগারে ফিরিয়ে দেন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাবা, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জি...

নতুন গানে সাবিনা ইয়াসমিন

বয়স ৭১ বার্ধক্যজনিত কারণে নানা অসুখের সঙ্গে লড়তে হয়েছে, হচ্ছে, তবু গানটাই যে...

হাম উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৩৫

দেশে ২৪ ঘণ্টায় (রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা) হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩...

গ্রামীণ জনপদের উন্নয়নে বদ্ধপরিকর সরকার: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী

গ্রামীণ জনপদের উন্নয়নে সরকার বদ্ধপরিকর মন্তব্য করে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা