বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটময়। দলমত নির্বিশেষে শুক্রবার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়ে পোস্ট দেন অনেকেই।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেছেন, মানুষের কাছে ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছেন খালেদা জিয়া, এটা এক প্রকার আশীর্বাদ।
শুক্রবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে এ কথা লিখেছেন তিনি। ফেসবুক পোস্টে ফারুকী লেখেন, ‘আমার নিউজফিড জুড়ে খালেদা জিয়ার জন্য মানুষের দোয়া প্রার্থনা। এবং এই পোস্টগুলা কোনো একটা নির্দিষ্ট দলের মানুষের না। একটা মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় অর্জন আর কি থাকতে পারে? কালচারাল সফট পাওয়ারের সাহায্য ছাড়াই, কোনো বুদ্ধিজীবী গ্যাংয়ের নামজপ ছাড়াই খালেদা জিয়া যেভাবে মানুষের কাছে হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিফাইং ক্যারেক্টার, এটা এক প্রকার ব্লেসিংস। সুস্থ হয়ে তিনি দ্রুতই বাসায় ফিরবেন এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ট্রানজিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন, এই প্রার্থনা।’
খালেদা জিয়ার জন্য সবার দোয়া কাছে দোয়া চেয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) সকালে ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘‘বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। রাজনীতি, দলমত, মতাদর্শ, সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে তার জন্য সবার দোয়া কামনা করি। এক সপ্তাহ আগে এক অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে খুব অল্প সময়ের দেখা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘দেশে থাকো, দেশের জন্য কাজ করো।’ অসংখ্য মানুষ একই উপদেশ দেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া যখন এই কথা বলেন তার গভীরতা, ইতিহাস, আর সত্যতা অন্যরকম। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতেও তিনি দেশ ও দেশের মানুষের পাশ থেকে সরে দাঁড়াননি। বেদনা, অপমান ও সীমাহীন প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের অবস্থান এবং বিশ্বাস থেকে আপস করেননি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তা আমাদের জন্য অনুকরণীয়। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করি, তিনি যেন বেগম খালেদা জিয়াকে রহমত, আরোগ্য ও শান্তি দান করেন।’’
শুক্রবার দিবাগত রাতে ফেসবুকে খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করেন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের প্রশ্নে সর্বদা আপসহীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।
শুক্রবার ফেসবুক পোস্টে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়েছিলাম। এখনি ফিরলাম। বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা একদমই ভালো না। সবাই দোয়া করবেন উনার জন্য।
শনিবার সকালে ফেসবুক পোস্টে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক অনন্য অনুপ্রেরণা। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে তিনি কয়েক দশক ধরে অবিচল ভূমিকা পালন করেছেন।’
‘ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রচক্রের লাগাতার নির্যাতন, মিথ্যা মামলার পরিক্রমা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভয়াবহতার মাঝেও তার অটল মনোবল ও আপসহীন অবস্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’
‘১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থান, স্বৈরতন্ত্রবিরোধী সংগ্রাম এবং পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রত্যেকটি পর্বে বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ়তা, দেশপ্রেম ও নেতৃত্ব জাতীয় জীবনে গভীর প্রভাব রেখেছে। বাংলাদেশের বহু প্রজন্ম তাকে দেখেছে সাহস, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে।’
‘বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থায় আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং এই সময়ে তার পরিবারের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা জানাচ্ছি। মহান আল্লাহ তা’আলার কাছে তার পূর্ণ আরোগ্য ও সুস্থতা কামনা করি। এই গণতান্ত্রিক উত্তরণের সংকটময় সময়, যখন দেশ পুনরায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, সে প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক উপস্থিতি ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় তার দীর্ঘ অবদান স্মরণ করে আমরা তার শীঘ্র সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করি।’
শনিবার সকালে ক্রিকেটার তামিম ইকবাল এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। জীবনে অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে তিনি টিকে থেকেছেন। এবারও সব শঙ্কা দূর করে তিনি হাসিমুখে ফিরবেন। সবাই তার সুস্থতার জন্য দোয়া করি।
শুক্রবার রাতে ফেসবুক পোস্টে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে বিএনপির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করছি। বিগত ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের’ অমানবিক আচরণ ও নিষ্ঠুরতার কারণেই খালেদা জিয়ার এমন শারীরিক অবস্থা তৈরি হয়েছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পরিপূর্ণ সুস্থতা কামনা করছি। বেগম খালেদা জিয়া আগামীর বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য, গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন, সংগ্রামের জন্য অনুকরণীয় এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত। খালেদা জিয়ার দীর্ঘায়ু বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ও বাংলাদেশি সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেন ফেসবুক পোস্টে বলেন, এই মুহূর্তে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্তে একজন মানুষ আছেন যাকে সবাই মানবে। আল্লাহর কাছে চাওয়া সামনের কঠিন সময় এবং দেশের একটা স্থিতিশীলতা পর্যন্ত খালেদা জিয়া যেন বেঁচে থাকেন।
এছাড়াও দলমত নির্বিশেষে আরো অনেক মানুষই খালেদা জিয়ার দোয়া চেয়েছেন। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তার দ্রুত সুস্থতা কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। শুক্রবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস অফিস জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন বাংলাদেশ সরকারপ্রধান। প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।
খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শুক্রবার রাতে ফেসবুকে পোস্টে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির সংবাদে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তার সার্বিক শারীরিক অবস্থার ব্যাপারে আমরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছি।
ডা. শফিকুর রহমান লিখেছেন, মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে আন্তরিক আরর্জি- আল্লাহ তা'য়ালা যেন তাকে দ্রুত পূর্ণ সুস্থতা দান করেন, সকল কষ্ট সহজ করে দেন এবং তার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করে দেন। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে রোগব্যাধি ও বিপদাপদ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।’
প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে ও জামায়াতের প্রার্থী মাসুদ সাঈদী শুক্রবার ফেসবুক পোস্টে বলেন, আমার গোটা হায়াতে আমি যতটুকু রাজনীতি দেখেছি, গোটা সময় জুড়ে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দলমতের ঊর্ধ্বে সব বাংলাদেশপন্থী ও মূল্যবোধপন্থী মানুষের অবিসংবাদিত নেত্রী ছিলেন। আমাদের মধ্যে ভিন্ন দলমত ছিল, কিন্তু খালেদা জিয়ার প্রশ্নে আমরা কখনো কোনো দলমতে ভাগ হই নাই। বিএনপি না করেও খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের অভিভাবক মেনে নিতে কোনো দ্বিধা আমাদের মধ্যে কোনো সময় কাজ করে নাই। দেশের এই ক্রান্তিকালে বিভক্তির এই সময়ে তার অভিভাবকতুল্য ছায়া বাংলাদেশের খুবই প্রয়োজন। হে আরশের মালিক! আপনার কাছে মিনতি করছি- বেগম খালেদা জিয়াকে আপনি সুস্থতার পূর্ণ নিয়ামত দান করুন, তাকে নেক হায়াত দান করুন। আল্লাহুম্মা রাব্বান নাস, আযহিবিল বাস, ইশফি আনতাশ শাফি, লা শিফায়া ইল্লা শিফাউক, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাকামা।
শুক্রবার ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদী ফেসবুক পোস্টে বলেন, কোনোদিন কোনো রাজনৈতিক নেতার সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছা হয় নাই। ছোটবেলা থেকে একটাই ইচ্ছা ছিলো- বেগম জিয়া পরম মমতায় আমার মাথায় হাত রেখে একটু দোয়া করে দিবেন কোনোদিন। ওনাকে রহম করো খোদা।
প্রসঙ্গত, ২৩ নভেম্বর রাত ৮টার দিকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় খালেদা জিয়াকে। ২৭ নভেম্বর দুপুরে নিউমোনিয়ার সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কায় তাকে সিসিইউতে নেওয়া হয়। মেডিক্যাল বোর্ডের একজন সদস্য জানান, বয়সজনিত কারণে সুস্থ হতে সময় লাগছে। সিসিইউতে নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। লন্ডন থেকে ডা. জুবাইদা রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরাও ভার্চুয়ালি বোর্ডের আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।
প্রায় ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস, আর্থরাইটিস ও কিডনি জটিলতাসহ নানা রোগে ভুগছেন। গত ২৩ নভেম্বর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
খালেদা জিয়ার আশু সুস্থতা কামনায় শুক্রবার বাদ জুমা সারাদেশে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করেছে দলটি।
● আমারবাঙলা/এফএইচ