দায়িত্ব পালনের পরিধি বাড়ার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের স্পষ্ট আইনি ক্ষমতা পেয়েছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। নতুন আইনের আওতায় এখন থেকে নির্দিষ্ট মামলার তদন্তভার এপিবিএনকে দেওয়া যাবে। একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বাহিনীটিতে সাইবার টিম গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উত্তরায় এপিবিএন সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সদর দপ্তরের ডিআইজি (অ্যাডমিন) ড. মোহাম্মদ শাহজাহান।
তিনি বলেন, নতুন আইনে এপিবিএনকে তদন্ত পরিচালনার সক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে সব ধরনের মামলা বাহিনীটি তদন্ত করবে না। সরকার, আদালত বা আইজিপির মাধ্যমে যেসব মামলা এপিবিএনের কাছে ন্যস্ত হবে, সেগুলোরই তদন্ত করা হবে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বিল, ২০২৬’ পাস হয়। এর মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশ’ বাতিল করে নতুন আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন আইনে বাহিনীটির দায়িত্ব ও কার্যপরিধিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এপিবিএন জানিয়েছে, নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো তদন্তের ক্ষমতা। এতদিন নির্দিষ্ট এলাকায় দায়িত্ব পালন করলেও বাহিনীটির নিজস্বভাবে তদন্ত পরিচালনার বিষয়টি আইনে স্পষ্ট ছিল না। এখন সরকারের অনুমোদন ও ন্যস্ত মামলার ভিত্তিতে সরাসরি তদন্ত করতে পারবে এপিবিএন।
বিশেষ করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘটিত অপরাধ তদন্তে এ ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে বাহিনীটি। বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে ক্যাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা পুলিশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে এপিবিএন।
ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক, অস্ত্র, অপহরণ, নারী নির্যাতন ও মানবপাচারসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এসব অপরাধ তদন্তে এপিবিএনের সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, নতুন সদস্যদের জন্য সাত দিনের একটি পরিচিতিমূলক প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তদন্ত কার্যক্রম জোরদারে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও বিশেষায়িত উপকরণ সংগ্রহের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় নতুন আইনে এপিবিএনের জন্য আলাদা সেল বা টিম গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে। দেশে সাইবার অপরাধ বাড়তে থাকায় বাহিনীর সক্ষমতার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এপিবিএনের বিভিন্ন ইউনিটে সাইবার অপরাধ মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তায় প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হবে। নজরদারি জোরদারে ড্রোন, নাইট ভিশন ডিভাইস ও সিসিটিভির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নতুন আইনে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও সেখানে সংঘটিত অপরাধের বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। এতদিন বিমানবন্দরে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করলেও এপিবিএনের আইনগত এখতিয়ার নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ছিল। নতুন আইনে বিমানবন্দরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রয়োজন অনুযায়ী অপরাধ তদন্তে বাহিনীটির ভূমিকা আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।
ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বিমানবন্দরে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজন মনে করলে এপিবিএন সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত করতে পারবে। তবে সব মামলার তদন্তভার বাহিনীটি নেবে না; সক্ষমতা ও প্রয়োজন বিবেচনায় নির্দিষ্ট মামলার দায়িত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরে বিভিন্ন সংস্থা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে। এপিবিএনের সঙ্গে অন্য কোনো বাহিনীর বিরোধ নেই। আইন ও পারস্পরিক সমন্বয়ের ভিত্তিতেই দায়িত্ব পালন করা হবে।
এ সময় বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নীতিমালার বিষয়ও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরে অপরাধ দমন, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও আইন প্রয়োগে পুলিশের ভূমিকা রয়েছে। নতুন আইনে এপিবিএনের সেই দায়িত্বের আইনগত ভিত্তি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও কার্যালয়ের বাইরের নিরাপত্তার দায়িত্বও নতুন আইনে এপিবিএনের কার্যপরিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগে এ ধরনের দায়িত্ব পালন করা হলেও এবার তা আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তাকে এপিবিএনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে ডিআইজি বলেন, প্রায় ১৮ লাখ মানুষের নিরাপত্তার বিপরীতে সেখানে এপিবিএনের সদস্য সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ২০০। জনবলের তুলনায় দায়িত্বের পরিধি বেশি হওয়ায় সেখানে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জনবল সংকট মোকাবিলায় নতুন একটি ব্যাটালিয়ন গঠনের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ইউনিট থেকে জনবল এনে ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক ও মানবপাচার নিয়েও এপিবিএনের কার্যক্রম তুলে ধরেন ডিআইজি। তিনি বলেন, ক্যাম্পের ভেতরে ইয়াবা তৈরির কারখানা থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন পথে মাদক ক্যাম্পে প্রবেশ করছে। মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক শনাক্তে ক্যাম্পের ভেতর ও বাইরে কাজ চলছে।
তিনি আরও জানান, ক্যাম্পে অবৈধভাবে ওষুধ তৈরি ও সরবরাহের ঘটনায় ইতোমধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরিতে সহযোগিতাকারীদের শনাক্তের কাজও চলছে।
এপিবিএনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নতুন আইনের পর বাহিনীর দায়িত্ব পালনে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, জনবল ও বিশেষায়িত সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ চলছে।
ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, এপিবিএন পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। প্রয়োজন ছাড়া সাধারণ পুলিশিংয়ে যুক্ত না হয়ে নির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে মনোযোগ দেওয়া হবে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা এলাকা, বিমানবন্দর, পার্বত্য অঞ্চল এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় বাহিনীর সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন আইনে তদন্তের ক্ষমতা যুক্ত হওয়ায় এপিবিএনের কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। তবে এ ক্ষমতা নির্দিষ্ট মামলা ও আইনগত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই প্রয়োগ করা হবে। তদন্তের মান নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আমার বাঙলা/ রাব্বি