গাইবান্ধা জেলার প্রধান চারটি নদ-নদীর একটি তিস্তা। শুকনো মৌসুমে নদীটি ধু-ধু বালুচরে পরিণত হলেও বর্ষায় থাকে পানিতে পরিপূর্ণ। তবে বর্ষায় কখনো ভয়াবহ রূপ নেওয়া এই নদীর পানির উচ্চতা ও প্রবাহ পরিমাপের জন্য গাইবান্ধা অংশে নেই কোনো গেজ স্টেশন বা নির্দিষ্ট পরিমাপ ব্যবস্থা।
ফলে তিস্তার গাইবান্ধা অংশের পানির স্তর জানতে নির্ভর করতে হয় প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে রংপুর জেলার কাউনিয়া গেজ স্টেশনের ওপর। এতে পানি বৃদ্ধি বা কমে যাওয়ার সরকারি সংকেত স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে অনেক সময় মিলছে না। ফলে নদীর অববাহিকা ও চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের পাশাপাশি কৃষকরাও নানা সমস্যায় পড়ছেন। বিভ্রান্তিতে পড়তে হয় স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদেরও।
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, হিমালয়ের সিকিমের পার্বত্য স্রোতধারা থেকে উৎপত্তি হওয়া তিস্তা ভারতের কুচবিহার হয়ে বাংলাদেশের নীলফামারীর ডিমলা দিয়ে প্রবেশ করেছে। পরে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর অতিক্রম করে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নে প্রবেশ করে নদীটি। উপজেলার উত্তর-পূর্বাংশ দিয়ে কয়েক কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে হরিপুর ইউনিয়নের বাংলা বাজারের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়েছে তিস্তা।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সূত্র ও গণমাধ্যমকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুমে জেলার ব্রহ্মপুত্র/যমুনা, তিস্তা, করতোয়া ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি-কমার তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এর মধ্যে তিনটি নদীর পানি পরিমাপের ব্যবস্থা গাইবান্ধায় থাকলেও তিস্তার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় রংপুরের কাউনিয়া স্টেশনের তথ্য। ফলে কাউনিয়া স্টেশনের পানির পরিবর্তনের প্রভাব গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ অংশে পৌঁছাতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লাগে।
স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী কাপাসিয়া, হরিপুর, চন্ডিপুর, শ্রীপুর, কঞ্চিবাড়ী, দহবন্দ, বেলকা ও তারাপুর ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ মানুষ প্রতি বর্ষা মৌসুমে বন্যার ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক সময় হঠাৎ করে পানি বেড়ে গেলে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হন নদীপাড়ের বাসিন্দারা।
সুন্দরগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক ও স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী সুদীপ্ত শামীম ঢাকা পোস্টকে জানান, প্রতি বছর বর্ষার সময় তিস্তা নদীর পানির বৃদ্ধি-কমার তথ্য নিয়ে আমাদের বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। কেননা, পানি উন্নয়ন বোর্ড তিস্তার পানি সংক্রান্ত পরিমাপের যে তথ্যটা সরবরাহ করেন সেটি কাউনিয়া স্টেশন থেকে নেওয়া। সুন্দরগঞ্জ থেকে সেটি ৪০/৫০ কিলোমিটার দূরের। যার কারণে আমাদেরকে কখনো কখনো নেতিবাচক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কাউনিয়া পয়েন্টে যদি দিনের ১২টায় বিপৎসীমার ৫ কিংবা ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিতের তথ্য নিশ্চিত করা হয় তবে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে এর প্রভাব পড়ে রাত ১২টার দিকে। যা কখনো কখনো আগাম বার্তা হলেও আতঙ্কের বড় কারণ হয়। আবার তার পরক্ষণই যদি পানি আর বৃদ্ধি না পায় তাহলে সুন্দরগঞ্জে অংশে কোনো প্রভাবই পড়ে না। যা সর্বসাধারণের জন্য বড় বিড়ম্বনার কারণ।
এছাড়া তিনি আরও বলেন, পানি বৃদ্ধির উচ্চতা এবং গতি যদি বেশি হয় তাহলে কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর থেকে পানি নিচে নেমে প্রবাহিত হলেও ১২ ঘণ্টা পর তা সুন্দরগঞ্জে এসে তার প্রভাব পড়ে। অথচ পাউবোর তথ্য অনুযায়ী আমাদেরকে পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এমন নিউজ প্রচার করতে হয়।
চন্ডিপুর ইউনিয়নের সচেতন নাগরিক বোচাগারী গ্রামের জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা যারা স্মার্ট ফোন ব্যবহার করি তারা তিস্তার পানি বেশি-কমের খবর নিয়ে অনেক সময় বিভ্রান্তিতে পড়ি। কারণ কখনো কখনো ফেসবুকে-খবরে পানি কমের খবর দেখি কিন্তু বাস্তবে পানি বাড়ে। আবার পানি বেশির খবর দেখলেও অনেক সময় এখানে পানি থাকে না।
সুন্দরগঞ্জর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাইয়ুম চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, এ রকমটা হয়ে থাকলে অবশ্যই স্থানীয়ভাবে পরিমাপক যন্ত্র স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। কেননা, কৃষকরা যখন পানি কমার খবর পেয়ে নিশ্চিত হয়, তখন যদি পানি বাড়ে তবে তা ফসলের জন্য বড় হুমকি। তিনি বলেন, স্থানীয় গেজ স্টেশন স্থাপন করা হলে কৃষকরা আগাম প্রস্তুতি নিতে পারবেন এবং এই আগাম বার্তা তাদের বন্যায় আর্থিক ক্ষতি কমাতে সাহায্য করবে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি ঢাকা পোস্টকে বলেন, কৃষি নির্ভর এ অঞ্চলে তিস্তার অববাহিকায় এবং সরাসরি নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে নানা ফসলের চাষাবাদ হয়। সেখানে পানির স্তর মাপার যন্ত্র না থাকলে বর্ষাকালে এটি কৃষি তথা তিস্তা কেন্দ্রিক মানুষের জন্য ঝুঁকি। তিস্তার সুন্দরগঞ্জে অবশ্যই পরিমাপক যন্ত্র স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বলা হবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে পানি-বৃদ্ধি কমের হিসেব অনুযায়ী গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ১০/১২ ঘণ্টা পর সেটির প্রভাব পড়ে।
এসময় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এভাবেই হয়ে আসছিল। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা হয়েছে। দ্রুতই গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জর তিস্তা এলাকায় পরিমাপক যন্ত্র স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গেল সপ্তাহ জুড়ে জেলার সবগুলো নদ-নদীর পানি কমলেও চলতি সপ্তাহের শুরু থেকে আবারও দ্রুত বাড়ছে সুন্দরগঞ্জের তিস্তার পানি। এছাড়া বাড়ছে ঘাঘট ও ব্রহ্মপুত্রেও।
এর মধ্যে তিস্তার পানি সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎমীমার ৪৮ সেন্টিমটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৯ তারিখেও এ নদীর পানি কমে ১০০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
এছাড়া এ নদীর পানি ২৯ জুন ও ১৪ জুলাই দুই দফায় বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই হয়ে মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। যদিও গাইবান্ধায় কোনো নদ-নদীর পানিই এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ২ আগস্ট সন্ধ্যা ৬ টার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রোববার সন্ধ্যা ৬ পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ১৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার মাত্র ৪৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৭০ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ২০৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে কেবল করতোয়ার পানি গোবিন্দগঞ্জের চকরহিমাপুর স্টেশন পয়েন্টে ২৯ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ৪২৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
আমার বাঙলা/ রাব্বি