বিভ্রান্তি ছড়ানো ব্যক্তিদের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশে অনেক বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী ও গুজব রটনাকারী রয়েছে। তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং অতীতে তারা কী করেছে, তা বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখতে হবে।
তিনি বলেন, দেশকে স্থিতিশীল রাখতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো বিভ্রান্তিকর বক্তব্যে প্রভাবিত হওয়া যাবে না। কেউ জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলে অতীতের মতো তাদের উপযুক্ত জবাব দিতে হবে।
রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে পুরাতন কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এবং ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, ভিক্ষু ও পাদ্রীসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সম্মানী প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে জেলার নারীদের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের হাতে সম্মানীর অর্থ তুলে দেন তিনি। এ ছাড়া অসচ্ছল ও প্রতিবন্ধীদের আর্থিক সহায়তার চেক এবং একজন প্রতিবন্ধীর হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়।
অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটে কিছু গোষ্ঠীর ভূমিকার সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, তাদের অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং গত ১৭ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রাজপথে তাদের ভূমিকা কী ছিল, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, গত ১৭ বছরের আন্দোলনে বিএনপি ও দলটির মিত্রদের নেতাকর্মীরা গুম, খুন, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
সাম্প্রতিক সংস্কার প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, যারা দীর্ঘদিন রাজপথের আন্দোলনে ছিলেন না, তারা এখন সংস্কারের নামে নানা বক্তব্য দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছেন। বিএনপি ২০২২ সালেই প্রথম রাষ্ট্রীয় সংস্কারের একটি রূপরেখা জনগণের সামনে তুলে ধরেছিল। এরও আগে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংস্কারের প্রাথমিক প্রস্তাবনা তৈরি হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের কার্যকর বাস্তবায়ন, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা প্রদান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষির আধুনিকায়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন শিল্পকারখানা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, দেশের মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে না পারলে প্রকৃত অর্থে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। শুধু বড় বড় স্লোগান দিলেই হবে না; প্রতিটি নাগরিককে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে হবে।
অন্য কোনো দেশের মডেল অনুসরণ না করে বাংলাদেশকে আত্মনির্ভরশীল ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা ও মর্যাদা পাবেন।
নারীদের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। তাদের বাদ দিয়ে কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারীদের আত্মনির্ভরশীল ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যেই ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি নারীদের স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ এবং ভালো ফলাফলের জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থার কথাও জানান তিনি।
কৃষক ও কৃষি খাতের উন্নয়নকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে কৃষক কার্ড চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে, যার সুফল পেয়েছেন প্রায় ১৩ লাখ কৃষক। সেচ সুবিধা বাড়ানো ও পানি সংকট মোকাবিলায় দেশব্যাপী প্রায় ২৫০ কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সনদ অর্জন নয়, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও ভাষাগত দক্ষতার দিক থেকেও যোগ্য করে গড়ে তোলা হবে। তাদের পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সুযোগ তৈরি করা হবে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চালু করা ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা আবারও চালুর ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, শিশু-কিশোরদের মেধা ও প্রতিভার বিকাশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কল্যাণে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজের দিকনির্দেশক হিসেবে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিবসহ অন্যান্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের আত্মনির্ভরশীল রাখতে বিশেষ সামাজিক ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে অসচ্ছল, প্রতিবন্ধী ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তাও অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও জানান, স্বৈরাচারী আমলে বঞ্চনার শিকার ১ লাখ ২৩ হাজার শিক্ষকের অবসর ভাতাসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করে তাদের অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
বিএনপি জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনীতি করে দাবি করে তারেক রহমান বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষায় সহায়তা, কৃষকের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নই তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য দেশের মানুষের জন্য কাজ করা এবং তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো। জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারলেই দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি সম্ভব হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান, মাজহারুল ইসলাম, জালাল উদ্দীনসহ সংশ্লিষ্টরা বক্তব্য দেন।
আমার বাঙলা/ রাব্বি