শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সাধারণত সংক্রমণ ও ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে সুরক্ষা তৈরি করে। তবে অটোইমিউন রোগের ক্ষেত্রে এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত শরীরের সুস্থ কোষ ও টিস্যুকে আক্রমণ করে। লুপাস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, সিলিয়াক ডিজিজ, সজোগ্রেন সিনড্রোম এবং অটোইমিউন থাইরয়েডের সমস্যাসহ ৮০টিরও বেশি অটোইমিউন রোগ রয়েছে।
অটোইমিউন রোগের শুরুতে সবসময় তীব্র উপসর্গ দেখা যায় না। অনেক সময় সাধারণ ক্লান্তি, মানসিক চাপ, বয়সজনিত সমস্যা বা হজমের গোলমালের মতো উপসর্গ দিয়ে এর শুরু হতে পারে। ফলে রোগ শনাক্ত করতে দেরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে কোনো উপসর্গ দীর্ঘদিন ধরে থাকলে বা বারবার ফিরে এলে, বিশেষ করে শরীরের একাধিক অংশে সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
অটোইমিউন রোগের সম্ভাব্য কিছু প্রাথমিক লক্ষণ হলো—
১. বিশ্রামের পরও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরও যদি দীর্ঘদিন ক্লান্তি থেকে যায়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। অটোইমিউন রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রদাহ শরীরের শক্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা বা অন্য কারণেও এমন ক্লান্তি হতে পারে। তাই কয়েক সপ্তাহ ধরে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ক্লান্তি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
২. গাঁটে ব্যথা ও সকালে জড়তা
শারীরিক পরিশ্রমের পর সাময়িক গাঁটে ব্যথা স্বাভাবিক। তবে একাধিক গাঁটে নিয়মিত ব্যথা, ফোলাভাব বা জড়তা দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দীর্ঘ সময় হাত-পা বা অন্যান্য গাঁট শক্ত হয়ে থাকা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো রোগের লক্ষণ হতে পারে।
৩. বারবার হালকা জ্বর
কোনো সংক্রমণের স্পষ্ট কারণ ছাড়াই বারবার বা দীর্ঘসময় হালকা জ্বর হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। লুপাসের মতো কিছু অটোইমিউন রোগে এমন জ্বর দেখা দিতে পারে। তবে অকারণ জ্বর মানেই অটোইমিউন রোগ নয়; বিভিন্ন সংক্রমণ ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণেও এটি হতে পারে।
৪. অকারণে ত্বকে ফুসকুড়ি বা পরিবর্তন
অটোইমিউন রোগের ক্ষেত্রে ত্বকে ফুসকুড়ি, লালচে ভাব, চুলকানি, দাগ বা রঙের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। লুপাসের ক্ষেত্রে গাল ও নাকের ওপর প্রজাপতির আকৃতির ফুসকুড়ি একটি পরিচিত লক্ষণ। নতুন কোনো ফুসকুড়ি বারবার দেখা দিলে বা এর সঙ্গে অন্য উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৫. হঠাৎ বা অতিরিক্ত চুল পড়া
স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন কিছু চুল পড়তে পারে। তবে হঠাৎ অতিরিক্ত বা নির্দিষ্ট জায়গায় ছোপ ছোপ করে চুল পড়ে গেলে কারণ খুঁজে দেখা দরকার। অ্যালোপেসিয়া অ্যারেটার মতো অটোইমিউন রোগে এমনভাবে চুল পড়তে পারে। আবার অটোইমিউন থাইরয়েডের সমস্যাতেও চুল পাতলা হওয়ার পাশাপাশি ক্লান্তি, ওজনের পরিবর্তন বা ঠান্ডা-গরম সহ্য করতে সমস্যা হতে পারে।
৬. দীর্ঘদিনের হজমের সমস্যা
পেট ফাঁপা, গ্যাস বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা অনেক সাধারণ কারণেও হতে পারে। তবে এসব উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা সিলিয়াক ডিজিজ বা ক্রোনস ডিজিজের মতো রোগের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। দীর্ঘদিন ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা, মলের সঙ্গে রক্ত বা কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমতে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
৭. অসাড়তা বা ঝিনঝিন অনুভূতি
হাত-পা সাময়িকভাবে অবশ বা ঝিনঝিন করা সাধারণত স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ার কারণে হতে পারে। তবে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই বারবার অসাড়তা, ঝিনঝিন করা বা অনুভূতির পরিবর্তন হলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। কিছু অটোইমিউন রোগ স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। অবশ্য ডায়াবেটিস, ভিটামিনের ঘাটতি বা অন্যান্য স্নায়বিক সমস্যার কারণেও এসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
মনে রাখবেন, এসব লক্ষণ দেখা দিলেই অটোইমিউন রোগ হয়েছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। একই ধরনের উপসর্গ বিভিন্ন সাধারণ রোগেও হতে পারে। তবে উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার দেখা দিলে সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
আমার বাঙলা/ রাব্বি