মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা, হাজিপুর ও রাজাপুর এলাকায় মনু নদীর চর কেটে এবং নদী খননের বালু অবৈধভাবে উত্তোলন ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাটিয়াজুড়ি সুন্দরপুর গ্রামের মেসার্স রাহি ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নাজমুন নাহার লিপি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেসার্স রাহি ট্রেডার্স বালু মহাল ইজারা লাইসেন্স নং ১/১৪২৭-এর আওতায় বালু উত্তোলনের অনুমতি পেলেও নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে মনু নদীর বিস্তীর্ণ চর কেটে বালু উত্তোলন করছে।
বর্তমানে পৃথিমপাশা–হাজিপুর–রাজাপুর সেতুর সংযোগ সড়কের প্রায় ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পে অবৈধভাবে মনু নদীর চর কেটে এবং নদী খননের সরকারি বালু ব্যবহার করে রাস্তার কাজ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বালু মহাল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব বালু সরবরাহ করছে।
স্থানীয়দের দাবি, দীপক দে ও কুটি মিয়া গং প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট সাইড ইঞ্জিনিয়ার রাহাতের যোগসাজশে লিজকৃত মহালের বালু দেখিয়ে প্রকৃতপক্ষে মনু নদীর চর কেটে বালু উত্তোলন করছে। উত্তোলিত বালু রাস্তা ভরাটের কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি সম্মান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে মজুত করে রাতের আঁধারে মাল্টি-এক্সেল ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে।
অবৈধভাবে চর কেটে বালু উত্তোলনের ফলে উদ্বোধনের আগেই রাজাপুর সেতুর মধ্যাংশ দেবে গেছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। এতে সেতুর স্থায়িত্ব মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি আশপাশের বসতবাড়ি ও মনু নদীর পরিবেশ মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে।
এ বিষয়ে কুলাউড়া উপজেলা প্রশাসনকে একাধিকবার জানানো হলেও কার্যকর কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। একবার দায়সারা ভাবে বালু উত্তোলনকারীদের এক লাখ টাকা জরিমানা করা হলেও এরপর তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
বর্তমানে ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে দিন-রাত একাধিক ট্রাকে করে পৃথিমপাশা–হাজিপুর সেতুর পাশের মনু নদীর বিশাল চর কেটে লাখ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের ছত্রছায়াতেই এই অবৈধ বালু ব্যবসা চলছে এবং ভবিষ্যৎ বিক্রির জন্য বালু অন্যত্র মজুত করা হচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—কার আশ্রয়ে চলছে এই অবৈধ কার্যক্রম? একই সঙ্গে স্থানীয় সুশীল সমাজের নীরবতাও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অতিরিক্ত লোড ও অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে মনু নদীতে ভাঙন, সংযোগ সড়কের ক্ষতি এবং সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি হলেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, জামিল ইকবাল নামে একজন ঠিকাদার রাস্তা নির্মাণের কাজ পাওয়ার পর দীপক দে নামে স্থানীয় এক ঠিকাদার বালু সরবরাহের দায়িত্ব নেন। তিনি ২০২২ সালে মনু নদী খননের সময় স্তুপ করে রাখা বালু অবৈধভাবে সংগ্রহ করে বর্তমানে রাস্তার কাজে ব্যবহার ও বিক্রি করছেন। পাশাপাশি আলীনগর মৌজার উপরিভাগ ও দত্তগ্রাম মৌজা থেকে নদীর চর কেটে বালু লুটপাট চালানো হচ্ছে।
মেসার্স রাহি ট্রেডার্সের লাইসেন্স দেখিয়ে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে ইজারা নেওয়া বালু মহালের বাইরে গিয়ে পৃথিমপাশা–হাজিপুর এলাকায় মনু নদীর চর কেটে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের সাইড ইঞ্জিনিয়ার রাহাতের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,
“আমাদের রাস্তার কাজে বালু সরবরাহ করছেন মেসার্স রাহি ট্রেডার্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার দীপক দে। তিনি জানিয়েছেন যে তার মহালের বালু দিচ্ছেন। এর বাইরে আমরা কিছু জানি না। এ বিষয়ে ম্যানেজার আখাইদ হোসাইন বিস্তারিত বলতে পারবেন।”
প্রকল্পের ম্যানেজার আখাইদ হোসাইন বলেন,
“আমরা শুধু রাস্তার কাজ করছি। বালু ও মাটি সরবরাহের দায়িত্ব মেসার্স রাহি ট্রেডার্সের। তারা কোথা থেকে বালু দিচ্ছেন, তা আমাদের জানা নেই।”
মেসার্স রাহি ট্রেডার্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার দীপক দে মোবাইল ফোনে বলেন,
“আমাদের সুখনবি, দাউদপুর, পাইকপাড়া, বাইগাঁও, কাউকাপন, জামলপুর, উপরিভাগ, মথাবপুর ও কটারকোনা মৌজায় মনু নদীর কিছু দাগ থেকে ১৪৩২ বাংলা সনের ৩০ চৈত্র পর্যন্ত বালু উত্তোলনের অনুমতি রয়েছে।”
তবে নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে নদীর চর কেটে বালু উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান এবং প্রতিবেদকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান।
এ বিষয়ে মেসার্স রাহি ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নাজমুন নাহার লিপি বলেন,
“আমরা কোটি টাকা রাজস্ব দিয়ে বালু মহাল লিজ নিয়েছি। আমাদের লিজে যে মৌজা রয়েছে, সেখান থেকেই বালু তোলার অধিকার আমাদের আছে।”
নদীর চর কাটার অনুমতি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে করা চুক্তিপত্রে রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন,
এ বিষয়ে আমার জানা নেই।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন,
বালু মহালের লিজগ্রহীতা নির্ধারিত জলসীমার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলন করতে পারেন না। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং খুব দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আমারবাঙলা/এসএবি