সংগৃহীত
জাতীয়

তাজরীন ট্র্যাজেডির এক যুগ: মানবেতর জীবনযাপন ভুক্তভোগীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় তোবা গ্রুপের তাজরীন ফ্যাশনস ট্র্যাজেডির এক যুগ পরও মানবেতর জীবনযাপন করছেন আহত শ্রমিক ও নিহতের স্বজনরা। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, দেনদরবার, আবেদন, শ্রদ্ধা নিবেদন ও মিডিয়ার প্রতিবেদনেই আটকে আছে ভুক্তভোগীদের পরিণতি। তবে নতুন সরকারের কাছে নতুন করে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি শ্রমিক নেতাদের।

শনিবার (২৩ নভেম্বর) বিকালে তাজরীন ফ্যাশনসে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটি পোড়া দাগ নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। সেই দিনের বিভীষিকাময় ক্ষত চিহ্ন নিয়ে ভবনটির আশেপাশেই বসবাস করছেন আহত শ্রমিকরা। তারা একটু ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের আশায় দিন পার করছেন।

আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় ছোট্ট একটি টঙ চা দোকান চালাচ্ছেন তাজরীন ফ্যাশনসে আগুনের ঘটনায় আহত শ্রমিক ফাতেমা খাতুন। গুরুতর আহত স্বামী রবিন বেপারী গত বছর হৃদরোগে ভুগে মারা যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরেছেন তিনি। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।

ফাতেমা খাতুন বলেন, আমি এ ছোট্ট চা দোকান দিয়ে টানাটানি করে সংসার চালাচ্ছি। আমার পাশে কেউ নাই। আমাকে দেখার মতন কেউ নাই। কিন্তু এ দোকানের আয় দিয়ে আমার সংসার চলে না।

ফাতেমার মতো রেহেনা আক্তার ও মুক্তা রানীসহ তাজরীন ট্র্যাজিডিতে আহত প্রায় সব শ্রমিকের একই অবস্থা।

রেহেনা আক্তার ও মুক্তা রানী বলেন, আজ ১২ বছর হলো, কেউ আমাদের খোঁজ-খবর রাখে না। শুধু বছর শেষ হলে মিডিয়ার ভাইয়েরা আমাদের খোঁজ করেন। তবু একটাই চাওয়া, আমরা নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি, সেই সঙ্গে আমাদের জীবনও যেন নতুন করে গড়ে ওঠে।

তাজরীন ফ্যাশনের তিন তলা থেকে লাফ দিয়ে নানা ধরনের শারিরীক সমস্যা নিয়ে দিনাতিপাত করছেন রেহেনা বেগম। তিনি বলেন, আমি তাজরীনের তিন তলায় স্যাম্পলে কাজ করতাম। আগুন লাগা দেখে আমি জানালা দিয়ে লাফ দিয়েছি, নাকি আমাকে কেউ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে আমার মনে পড়ে না। তবে আমি তিনতলা থেকে পড়ে গিয়ে আমার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়। আমার ঘারের হাড় ফেটে যায়। আমার বোন, বোনের স্বামী, আমার ভাগিনাসহ পরিবারের চার সদস্য তাজরীনের আগুনে পুড়েছে। শুধু আমি বেঁচে আছি। আমাকে আইএলও থেকে শুধু চার লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো সুচিকিৎসা পাইনি। যে টাকা সহায়তা পেয়েছিলাম সেই টাকা দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছি। এ ছাড়া একটি জমি বিক্রি করেও আমার চিকিৎসা করেছি। এখনো আমি অক্ষম। কোনো কাজ করতে পারি না। আমার সন্তানের লেখাপড়া করাতে পারি না, ভালো খাবার দিতে পারি না। অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি হলেও অন্তত স্বস্তি পেতাম। কিন্তু ঘটনার ১২ বছর অতিবাহিত হলেও এখনো কারো শাস্তি হলো না। আমরা সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসন চাই। আমরা ভিক্ষা চাই না।

আহত শ্রমিক নাজমা আক্তার বলেন, আমাদের বিগত সরকার নানা সময়ে পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। তবে নতুন শ্রম উপদেষ্টা আমাদের ডেকে নিয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। খুব দ্রুত আমাদের জন্য কিছু একটা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। আমরা দ্রুত আহত শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসার দাবি জানাই।

তাজরীনের চার তলায় কাজ করতে রাজবানু। তিনিও শারিরীক নানা সমস্যায় ভুগছেন। দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে এখনো বসবাস করছেন। তিনি বলেন, আমরা ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। আমরা চিকিৎসা নিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ না হলেও নতুন করে চাকরি নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো কারখানা কর্তৃপক্ষ আমাদের চাকরি দেয়নি। গেটে গেলে তাজরীনের শ্রমিক বলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা কোথাও চাকরি পাইনি। সে কারণে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। আমরা আগের মতো বাঁচতে চাই, কাজ করে খেতে চাই। আমরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে দাবি জানাই, আমাদের যেন পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। যদিও শ্রম উপদেষ্টা আমাদের বিভিন্ন আশ্বাস দিয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং পুনর্বাসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানালেন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।

বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অরবিন্দু বেপারী বিন্দু বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাতের একটি বিভীষিকাময় দিন ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর। এই দিনে আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়েছেন ১১৭ জন ও আহত হয়েছেন অন্তত দুই শতাধিক শ্রমিক। তাদের কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। যা দিয়েছে তা বিভিন্ন সংগঠন থেকে সহযোগিতা মাত্র। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমরা চাই প্রতিটি আহত শ্রমিক ও নিহতের পরিবার যেন তাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পায়। এ ছাড়া তাজরীনের পরিত্যক্ত ভবনটি সংস্কার করে দ্রুত শ্রমিকদের জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণের দাবি জানাই। যেখানে সকল শ্রমিকের বিনা খরচে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।

বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি তুহিন চৌধুরী বলেন, নতুন সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, যাতে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করা হয়; খোঁজ-খবর নিয়ে যৌক্তিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হয়।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাভার-আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, দেশে এখন নতুন সরকার। এখন দেলোয়ারসহ দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করার একটা আশা আমরা করতে পারি।

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তাজরীন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডে ১১৭ পোশাককর্মী প্রাণ হারান এবং আহত হন অন্তত দুই শতাধিক। কারখানাটিতে এক হাজার ১৬৩ জন শ্রমিক কাজ করতেন। তবে দুর্ঘটনার সময় ৯৮৪ জন শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। মরদেহ শনাক্ত হওয়ায় ৫৮ জনকে পরিবার ও স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অন্যদের মরদেহ শনাক্ত না হওয়ায় তাদের জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

আমারবাঙলা/এমআরইউ

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম

আবারও দেশের বাজারে বেড়েছে স্বর্ণের দাম। সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের...

বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত জোরিস ভ্যান বোমেল বিরোধীদলীয় নেত...

২ লাখ আশ্রয়প্রার্থীর ভিসা বাতিল করবে যুক্তরাষ্ট্র

বাণিজ্য ও পর্যটন ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন—এমন প্রা...

ফায়ার সার্ভিস-ARAB-এর যৌথ অভিযান

দুর্যোগকালীন সময়ে দেশব্যাপী বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রেখে ফায়ার সার্ভিসের...

আগামী জুলাইয়ের মধ্যে পাঁচ স্থানীয় নির্বাচন

আগামী বছরের জুলাইয়ের মধ্যেই স্থানীয় সরকার কাঠামোর পাঁচটি নির্বাচন—ইউনিয়...

বরিশালে হাম উপসর্গে ২ শিশুর মৃত্যু

বরিশাল বিভাগে হাম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গ নিয়ে...

যমুনায় দুই নদীবন্দর, ২০০ কিমির পথ কমে ১৬ কিমি

এক পাশে বগুড়ার সারিয়াকান্দি, অন্য পাশে জামালপুরের মাদারগঞ্জ। মাঝখানে যমুনা নদ...

মক্কা জোটের পর ফ্রান্সের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা চুক্তি সৌদির

তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ‘মক্কা জোট’ গঠনের পর এবার ফ্রান্সের সঙ...

পাকিস্তানের হাসপাতালে আগুন, পুড়ে মরল ১৫ নবজাতক

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে একটি হাসপাতালের গায়নোকোলজি ওয়ার্ডে ভয়াবহ অগ্নি...

২২ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে শতাধিক রোগী, মেঝেতেই চিকিৎসা

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা