জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিশ্বশান্তি রক্ষা, জলবায়ু ন্যায়বিচার (ক্লাইমেট জাস্টিস), নিরাপদ অভিবাসন এবং টেকসই অর্থায়নের স্বার্থে বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া ভাষণে তিনি ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার চিত্র তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন সংকট, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নীতিমালাসহ জরুরি বৈশ্বিক ইস্যুতে বাংলাদেশের অটল অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তিনি এ ভাষণ দেন। এতে সভাপতিত্ব করেন ড. খলিলুর রহমান।
ভাষণের শুরুতে বৈশ্বিক সংঘাত, অর্থনৈতিক চাপ ও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। সামরিক খাতে বাজেট বরাদ্দ কমানোর আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ ও পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধের নীতিতে বিশ্বাসী। মারণাস্ত্র নয়, পরিবর্তন ও যোগাযোগের মূল হাতিয়ার হওয়া উচিত যুক্তি, কূটনীতি ও মানবতা। ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবির প্রতি বাংলাদেশের ধারাবাহিক সমর্থনের কথাও তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন।
রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ওপর সৃষ্ট চাপের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সূচনা মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। তিনি রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন।
কার্বন নিঃসরণে নগণ্য ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে উল্লেখ করে ক্লাইমেট জাস্টিস ও অর্থায়নের ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নের মতো অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপের চিত্র তিনি জাতিসংঘে তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের ওয়াটার কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করেছে বলেও তিনি জানান।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এসময় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রকাঠামো ও অর্থনীতি পুনর্গঠনে সরকার Recovery, Restoration and Reconstruction (৩-আর) কৌশল অনুসরণ করছে।
এসডিজির ‘Leave No One Behind’ মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারের ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির বাস্তবায়ন তুলে ধরা হয়। নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে ফ্যামিলি কার্ডসহ ফার্মার্স কার্ড, ই-হেলথ কার্ড চালু এবং ভবিষ্যতে ইউনিভার্সাল কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। বাজেটে শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং আগামী পাঁচ বছরে তা জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য তুলে ধরেন তিনি। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, ব্যাগ ও দুপুরের খাবার চালু হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। সিলেবাসে স্পোর্টস অন্তর্ভুক্তির কথাও তিনি জানান।
ডিজিটাল ডিভাইড যেন এআই ডিভাইডে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে জাতিসংঘকে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। দেশে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলারের স্টার্ট-আপ তহবিল বরাদ্দের কথাও তিনি উল্লেখ তারেক রহমান। বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে রূপান্তরের লক্ষ্যে বিশ্ব অংশীদারদের বিনিয়োগের আহ্বান জানান তারেক রহমান। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণকে টেকসই করতে বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন তিনি।
পরিশেষে ‘সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ’ চেতনার মাধ্যমে একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।