চকরিয়া ছেলের হাতের ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছিল ফোঁটায় ফোঁটায়। সেই লাল রক্ত দেখে কলিজা ফেটে যাচ্ছিল বাবা নুরুল ইসলামের। ঘরে মন টিকছিল না তার। ১১ বছরের আদরের ধন শামীমকে সুস্থ করতে হবে—এই এক ব্যাকুলতা নিয়ে তাকে মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়েছিলেন। পরম মমতায় ছেলেকে জাপ্টে ধরে দ্রুত ছুটছিলেন হাসপাতালের দিকে। বাবার মনে তখন একটাই প্রার্থনা,ছেলের হাতটা যেন দ্রুত সেরে ওঠে।
কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! সেই রক্ত আজ রাজপথের ধুলোয় মিশে একাকার হয়ে গেল। ঘাতক ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে চকরিয়ার মহাসড়কেই নিভে গেল এক বাবার জীবনপ্রদীপ। আর কয়েক ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে আজ ভোরে সেই বাবার পথেই পাড়ি জমালো আদরের সন্তান শামীমও। পরম মমতায় আগলে রাখা বাবা আর তার ছায়া হয়ে থাকা ছেলের এই বিদায় যেন স্তব্ধ করে দিয়েছে পুরো কক্সবাজারকে।
যেভাবে ভেঙে চুরমার হলো সব স্বপ্ন
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মোহেজার পাড়া গ্রামে যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিল, তখন নুরুল ইসলামের ঘরে চলছিল হাহাকার। বাড়িতে কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত শামীমের হাত কেটে যায়। রক্তক্ষরণ কিছুতেই থামছিল না। বিচলিত বাবা কোনো অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষা না করে নিজের মোটরসাইকেলেই ছেলেকে নিয়ে চকরিয়া সরকারি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
রাত তখন সোয়া আটটা। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নাভানা গ্যাস পাম্প এলাকায় পৌঁছাতেই বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসা একটি দ্রুতগামী রেজিস্ট্রেশনবিহীন ড্রাম ট্রাক পিষে দেয় তাদের স্বপ্নকে। মোটরসাইকেলটি দুমড়েমুচড়ে যায়, ছিটকে পড়েন বাবা ও ছেলে।
একই উঠোনে দুই নিথর দেহ
স্থানীয়রা রক্তাক্ত অবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক নুরুল ইসলামকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, সংকটাপন্ন শামীমকে দ্রুত। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছেলের ও মৃত্যু হয় তখন পুরো এলাকায় কান্নার রোল পড়ে যায়।
ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে বাবা নিজেই লাশ হয়ে ফিরলেন। আর যে ছেলের জন্য বাবার এই লড়াই, সেই ছেলেও বাবাকে একা ছাড়ল না।" — কান্নারত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন এক প্রতিবেশী।
শনিবার সকালে মোহেজার পাড়ার একই উঠোনে যখন বাবা ও ছেলের নিথর দেহ পাশাপাশি রাখা হয়, তখন আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে স্বজনদের আহাজারিতে। এমন করুণ দৃশ্য দেখে পাথর হয়ে গেছেন এলাকাবাসীও।
ঘাতক ট্রাক ও প্রশাসনের ভূমিকা
চিরিংগা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আরিফুল আমিন জানান, "ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। ঘাতক ড্রাম ট্রাক ও দুর্ঘটনাকবলিত মোটরসাইকেলটি আমাদের হেফাজতে রয়েছে। চালক পলাতক থাকলেও তাকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।"
রক্তস্নাত মহাসড়ক ও জনরোষ
মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন ড্রাম ট্রাকের অবাধ চলাচলই এই অকাল মৃত্যুর কারণ বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। শোকস্তব্ধ গ্রামবাসীর একটাই দাবি—এই ঘাতক চালকের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়। তারা বলছেন, আর কোনো বাবাকে যেন তার সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে এভাবে রাজপথে প্রাণ দিতে না হয়।
পরপারে হয়তো বাবা নুরুল ইসলাম এখনো তার ছেলের হাতটি শক্ত করে ধরে আছেন, যেমনটা তিনি ধরেছিলেন সেই অভিশপ্ত রাতে। শুধু এই পৃথিবীতে পেছনে পড়ে রইল এক বুক হাহাকার আর বিচারহীনতার চিরচেনা আর্তি।
আমারবাঙলা/এনইউআ