শেরপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী খাবারের নাম ‘পিঠালি’ বা ‘মেন্দা’। অনেকেই আবার মেলানি, মিলানি বা মিল্লি বলেও চিনে থাকে। এই পিঠালির উৎপত্তি জামালপুর জেলায় হলেও শেরপুর জেলার চরাঞ্চলসহ শহরেও এর প্রচলন ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। পিঠালি ডাল-ভাতের মতো প্রতিদিনের খাবার নয়। এটি মূলত উৎসবের খাবার।
পিঠালির প্রচলন কীভাবে বা এটি প্রথম চালু হয় কখন—এর সঠিক কোনো ইতিহাস না থাকলেও প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, আঠারো শতকের প্রথম দিকে জামালপুরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলজুড়ে টাঙ্গাইল এবং আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ এসে বিচ্ছিন্ন জনবসতি গড়ে তোলে। সে সময় ইংরেজ শাসনামলে গ্রাম্য সামাজিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। ধারণা করা যায়, সে সময়েই পিঠালি এক বিশেষ খাবার হিসেবে মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।
পিঠালি তৈরির প্রধান উপকরণ গরুর মাংস, চালের গুঁড়া, পেঁয়াজ, রসুন, জিরাসহ প্রায় ১০ প্রকারের মশলা। সুস্বাদু এই খাবারের বিশেষত্ব হলো এর নরম মাংস, চর্বি ও হাড়—যা ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে কলাপাতায় পরিবেশন করা হয়।
পিঠালি তৈরির জন্য প্রথমেই দরকার হয় মাংস। গরু, ছাগল, মহিষ বা মুরগির মাংস দিয়ে খুব সহজেই রান্না করা যায়। এ ক্ষেত্রে গরুর মাংস ভিন্ন স্বাদ এনে দেয়। মাঝারি বা বড় করে মাংস কেটে এরপর হাড়িতে লবণ ও মরিচ দিয়ে সেটি সেদ্ধ করা হয়। এরপর চালের গুঁড়া দেওয়া হয় এবং পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন মশলা যোগ করে বাগাড় দিতে হয়। এভাবে কিছু সময় পর তৈরি হয়ে যায় ধোঁয়া ওঠা লোভনীয় পিঠালির চেহারা। গরম হাড়িতে পিঠালির ঘ্রাণ যেকোনো মানুষের জিভে জল এনে দিতে সক্ষম।
শেরপুর জেলার চরাঞ্চলের মধ্যে শেরপুর সদর উপজেলা ও শ্রীবরদী উপজেলায় এক সময় এর প্রচলন থাকলেও বর্তমানে এই পিঠালির প্রচলন শহরেও দেখা যাচ্ছে। আধুনিক যুগে তরুণ প্রজন্মের মেয়েরা ঘরে বসে ইউটিউব ঘেঁটে নানা রেসিপি বানাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তৈরি করা হচ্ছে নানা রকম বাহারি স্বাদের খাবার। তাই অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো।
এমতাবস্থায় এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে স্থানীয়রা উদ্যোগ নিয়েছে। এক সময় শুধু উৎসবে পরিবেশন করা হলেও এখন অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে পিঠালি বিক্রি করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শেরপুর শহরের গৌরীপুর মহল্লায় নিজামুল নামে এক ব্যক্তি পিঠালি তৈরি করে বিক্রির উদ্যোগ নেন। ওই এলাকায় প্রতিবছরই এভাবে একদিন পিঠালি তৈরি করে বিক্রি করা হয়।
ওইদিন সকাল থেকেই মাইকিং করে প্রচার করা হয় পিঠালি বিক্রির কথা। মাইকিং শুনে এলাকার মানুষ দুপুরের পর কিনে নেয় ঐতিহ্যবাহী এই খাবার পিঠালি।
পিঠালি কেবল মানুষের প্রতিদিনের খাবার নয়। এটি সাধারণত আকিকা, বিয়ে, মৃত্যুবার্ষিকী, খতনা, চল্লিশা/লিল্লা, নির্বাচনী প্রচারণাসহ বিশেষ সামাজিক অনুষ্ঠানে খাবার হিসেবে প্রচলিত রয়েছে। এই খাবার না থাকলে অনুষ্ঠানের প্রাণই থাকে না। তাই অনুষ্ঠানের আয়োজকরা পিঠালিকেই গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশন করেন।
এ অঞ্চলের প্রসিদ্ধ কোনো অনুষ্ঠানে ধনী-গরিব সবাই মাটিতে বসে কলাপাতায় গরম ভাত আর সুস্বাদু পিঠালি খায়। কলাপাতা ছাড়া অন্য পাত্রে পিঠালির প্রকৃত মজা পাওয়া যায় না। এলাকা ভেদে পিঠালির ভিন্ন নাম রয়েছে। শত বছরের বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলে পিঠালি প্রচলিত রয়েছে।
১৯৭১ সালের আগেও এই পিঠালির জনপ্রিয়তা ছিল অনেক। প্রতিটি উৎসবে খাবারের প্রধান আকর্ষণ ছিল পিঠালি। এখন আধুনিক যুগের নানা রেসিপির আওয়াজ থাকায় নতুন প্রজন্মের কাছে পিঠালি খুব একটা জনপ্রিয় নয়। তবে এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখে এখনো অনেকেই প্রতিবছর শীত মৌসুমে বিশেষ আয়োজন করে রান্নার মাধ্যমে পিঠালি বিক্রি করছেন।
জেলার শ্রীবরদী ও সদর উপজেলার চরাঞ্চলের বেশ কিছু গ্রামের বাজারে এখনো সপ্তাহের হাটের দিন নির্ধারিত দু-একটি হোটেলে এই পিঠালি বিক্রি করা হয়। স্বাধীনতার আগেও এই অঞ্চলে বিচার-সালিশ বা বিয়েবাড়িতে এই খাবার পরিবেশন করার রেওয়াজ ছিল।
তবে পিঠালিকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এই খাবার জামালপুর ও শেরপুরবাসীর সকলেরই প্রিয়। পিঠালি খেলেই শুধু বোঝা যায়—কেন এই পিঠালির নাম শুনলেই জিভে পানি চলে আসে।
আমারবাঙলা/এসএবি