কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার এলঙ্গী এলাকায় গড়াই নদীর ড্রেজিংকৃত বালি অপসারণের আড়ালে ফসলি জমির মাটি লুটপাটের এক মহোৎসব চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বালি ও মাটি বহনের ভারী ড্রামট্রাকের দাপটে এলাকার রাস্তাঘাট ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঘরবাড়ি। এতে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা। বালি ঘাট দখল এবং লভ্যাংশের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে এলাকায় একাধিকবার গোলাগুলি ও আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন এবং মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে ঘাটের লভ্যাংশ ভাগবাটোয়ারা হওয়ায় এই অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের মে মাসে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) থেকে কুমারখালীর এলঙ্গী এলাকায় ৭৯ লক্ষ ৭৪ হাজার টাকায় গড়াই নদীর ২ লক্ষ ২ হাজার ৫০০ ঘনমিটার ড্রেজিংকৃত বালি অপসারণের কার্যাদেশ পায় 'সৈকত এন্টারপ্রাইজ' নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কার্যাদেশ পাওয়ার পর থেকেই মূলত ঘাট দখল ও লভ্যাংশ নিয়ে এলাকায় বিশৃঙ্খলা শুরু হয়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের হাতে আসা একটি লভ্যাংশ বণ্টনের তালিকা অনুযায়ী, এই বালি ঘাট থেকে প্রাপ্ত আয়ের ৪০ শতাংশ যাচ্ছে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনছার প্রামাণিকের পক্ষে এবং ৪০ শতাংশ যাচ্ছে উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর মো: সামছুদ্দিনের পক্ষে। অবশিষ্ট ২০ শতাংশ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও প্রতিদিন কুমারখালী থানা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অফিসের নামে নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসোহারা বা বরাদ্দ যায় বলে অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী।
বিপর্যস্ত জনজীবন ও স্থানীয়দের ক্ষোভে এলঙ্গী ও লালন বাজার এলাকার বাসিন্দারা জানান, দিন-রাত সমানে শত শত ড্রামট্রাক চলাচলের কারণে গ্রামীণ সড়কগুলো চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ট্রাকের ধুলোবালি ও কম্পনে ঘরবাড়ির ক্ষতি হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। বালি কাটার নির্ধারিত সীমানা পেরিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কৃষকদের ফসলি জমির মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে, যা কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
তবে অর্থ ভাগবাটোয়ারার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর মো: সামছুদ্দিন বলেন, "প্রথম দিকে ৪০ শতাংশ করে ভাগ পাওয়ার বিষয়টি সত্য হলেও, এলাকায় গোলাগুলির ঘটনার পর থেকে আমি আর এই বালি ঘাটের সাথে কোনোভাবেই যুক্ত নই।"
অন্যদিকে, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনছার প্রামাণিক তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী আমার নাম ভাঙিয়ে এই কাজ করতে পারে।"
বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল হোসেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আক্তার। তাঁরা জানান, এ ধরনের কোনো ভাগবাটোয়ারা বা মাসোহারার বিষয় তাঁদের জানা নেই। তবে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান জানান, "বালি অপসারণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে নিয়ম মেনে। তবে এর বাইরে গিয়ে যদি ফসলি জমির মাটি কাটা বা কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে ঘাট বাতিল করা হবে।"
বালি মহালের নামে এই নৈরাজ্য বন্ধ করে ফসলি জমি রক্ষা ও এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে ঊর্ধ্বতন মহলের দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
আমার বাঙলা/ রাব্বি