মৌলভীবাজারের বড়লেখায় বাংলাদেশ চা বোর্ড নিয়ন্ত্রিত নিউ সমনবাগ, পাথারিয়া ও মোকাম চা বাগানের শ্রমিক ও অডিট টিমের মধ্যকার আগে মীমাংসিত একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। তিন বাগানের কর্মকর্তা-কর্মচারিসহ মোট ৯৪ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছে চা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। এতে শ্রমিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ, অসন্তোষ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
মঙ্গলবার সকালে ভুক্তভোগী চা শ্রমিক ও শ্রমিক নেতারা বাগান ব্যবস্থাপকের কার্যালয় ঘেরাও করে প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান।
জানা গেছে, নিউ সমনবাগ, মোকাম সেকশন ও পাথারিয়া চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরি বন্ধ এবং অডিট টিমের সদস্যদের আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে গত ১৩ জানুয়ারি প্রায় দেড় হাজার বিক্ষুব্ধ শ্রমিক বাগান ম্যানেজার, কর্মচারী ও অডিট টিমের সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। এতে বাগানে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গালিব চৌধুরী, বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান খান, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ইমরান আহমদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এ সময় অডিট টিমের প্রধান মো. সাইফুল ইসলাম নারী শ্রমিকদের প্রতি অসদাচরণ ও আপত্তিকর মন্তব্যের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চান। তিনি শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ ও অন্যান্য দাবি-দাওয়া চা বোর্ডকে যথাযথভাবে অবহিত করার আশ্বাস দেন। পরে ইউএনও, ওসি, ইউপি চেয়ারম্যান, শ্রমিক নেতা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে বিষয়টি মীমাংসা হয় এবং শ্রমিকরা অবরোধ প্রত্যাহার করেন।
কিন্তু ঘটনার এক মাস তিন দিন পর, ১৬ ফেব্রুয়ারি চা বোর্ডের সচিব মো. মমিনুর রশীদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ১৩ জানুয়ারির ঘটনায় ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির’ অভিযোগ এনে ৯৪ জনের বিরুদ্ধে থানায় ফৌজদারি মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মামলা করার জন্য নিউ সমনবাগ চা বাগানের ব্যবস্থাপক এমদাদুর রহমানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অভিযুক্তদের তালিকায় সহকারী ব্যবস্থাপক রাজ নারায়ন পাল, করণিক রামসুজন ভর, স্টোর ক্লার্ক শ্রীকুমার, হেড ক্লার্ক এস এম শাহিন, টিলা ক্লার্ক দীপক কুর্মি, কামাল হোসেন, সঞ্জিত রবিদাস, সন্দ্বীপ সিংহ, টিলা স্টাফ জিতেন, নিখিল সাঁওতাল, অজিত রবিদাসসহ মোট ৯৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকের নাম রয়েছে।
এ নির্দেশের খবর ছড়িয়ে পড়লে সমনবাগ, পাথারিয়া ও মোকাম সেকশনের শ্রমিকরা ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন। মঙ্গলবার সকালেই তারা বাগান ব্যবস্থাপকের কার্যালয় ঘেরাও করে প্রতিবাদ জানান।
শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করে বলেন, শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের উদ্যোগ না নিয়ে চা বোর্ড উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে চাকরিচ্যুতির ষড়যন্ত্র করছে। তাদের দাবি, অডিট টিমের সদস্যরা নারী শ্রমিকদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করায় শ্রমিকরা প্রতিবাদ করেছিলেন। পরে অডিট টিম ক্ষমা চেয়ে দুঃখ প্রকাশ করায় বিষয়টি মীমাংসা হয়েছিল। এক মাস পর হঠাৎ ফৌজদারি মামলার নির্দেশ দেওয়ার পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
নিউ সমনবাগ চা বাগানের ব্যবস্থাপক এমদাদুর রহমান বলেন, “চা বোর্ড থেকে ৯৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকের একটি তালিকা পাঠানো হয়েছে। ১৩ জানুয়ারির ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
এ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ মিঠু বিষয়টি অবহিত হয়ে প্রতিনিধির মাধ্যমে বাগান ব্যবস্থাপককে জানিয়েছেন, তিনি শপথ গ্রহণ শেষে এলাকায় ফিরে বিষয়টি দেখবেন। ততক্ষণ পর্যন্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের না করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব ইকবাল হোসেন ও দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, ১৩ জানুয়ারির ঘটনাটি ইউএনও ও থানার ওসির উপস্থিতিতে মীমাংসা হয়েছে। ওই ঘটনায় নিরীহ শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার মতো কিছু ঘটেনি বলেও তারা দাবি করেন।
এদিকে চা শ্রমিকদের মধ্যে এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, দ্রুত সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
আমারবাঙলা/এসএ