ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সম্প্রতি দিল্লিতে তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই আজ সোমবার (১০ আগস্ট) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে বসে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা, সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা এবং পুশ-ইনের মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্কে সংবেদনশীল হয়ে আছে। এসব ইস্যুর মধ্যেই ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠককে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক মহলের ধারণা, এই বৈঠকের মাধ্যমে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক আগামী দিনে কোন দিকে এগোবে, সে বিষয়ে কিছুটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে আগামী সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত মিলতে পারে। ভারত ইতোমধ্যে সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে অংশ নিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
সাক্ষাৎ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি নন ঢাকায় দায়িত্ব পালনরত কূটনীতিকরা। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ এবং দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়েও আলোচনায় অগ্রগতি হতে পারে।
এর আগে রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। বৈঠকে কোন কোন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে দুই পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানায়নি। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরে ফিরে তিনি পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামকে নিয়ে এক ঘণ্টারও বেশি সময় আলোচনা করেন বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
রোববার ঢাকার এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রসঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে আলোচনা হলে অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। তার ভাষায়, কথাবার্তার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হয় এবং এ ক্ষেত্রে তিনি ইতিবাচক সম্ভাবনা দেখছেন।
শেখ হাসিনার বক্তব্য ঘিরে টানাপোড়েন
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে সাম্প্রতিক উত্তেজনার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বার্ষিকী উপলক্ষে দিল্লি থেকে তার ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে তা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের কাছে উদ্বেগও জানিয়েছিল।
অন্যদিকে ভারত জানিয়েছে, শেখ হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে তাদের সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং বাংলাদেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে দেওয়া বক্তব্যকে ভারত সমর্থন করে না।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, ভারত যদি শেখ হাসিনাকে দেশটিতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেয়, তাহলে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে ভারতকে নতুন করে ভাবতে হবে।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পরে বিএনপির নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে আগ্রহ দেখায়।
এর ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা উপস্থিত হয়ে নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানান। পরবর্তী সময়ে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ পর্বেও তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানায় ভারত।
একজন সাবেক কূটনীতিক মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক হলে বর্তমান টানাপোড়েনের অনেক বিষয়ই স্পষ্ট হতে পারে। তার মতে, দুই দেশের মধ্যে সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়লে সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও সেখান থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়াই সম্পর্কের অন্যতম বড় জটিলতা। তবে দুই সরকারের সম্পর্ক স্বাভাবিক ধারায় এগোলে পরিস্থিতিরও পরিবর্তন হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়েও এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় হয়নি বলে মনে করেন ওই কূটনীতিক। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সফরের অনুকূলে না থাকলেও আগামী কয়েক দিনে সম্পর্কের উন্নতি হলে সফরের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। তাই এ বিষয়ে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করা প্রয়োজন।
আমার বাঙলা/ রাব্বি