মতামত

প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তারেক রহমানের ৮৫ দিন

মতামত

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে ১২ মে ২০২৬ পর্যন্ত—এই ৮৫ দিনের সময়কাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরপর্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সময়ের দিক থেকে সংক্ষিপ্ত হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতায় এই সময়কে একটি “প্রাথমিক ভিত্তি নির্মাণের অধ্যায়” হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এই সময়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শুরু এবং ডিজিটাল রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার মধ্য দিয়ে সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ফলে প্রথম ৮৫ দিন ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কার্যকর করা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য একটি সুসংগঠিত দিকনির্দেশনা তৈরি করার সময়।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন

সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা। দীর্ঘ অস্থিরতার পর প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় করা এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা ছিল মূল লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান “নতুন বাংলাদেশ” গড়ার ঘোষণা দিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা তুলে ধরেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রকে জনগণের সেবামুখী কাঠামোতে রূপান্তর করা।

এই সময় রাজনৈতিক সংলাপ বৃদ্ধি, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও গতি আনার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা

দেশের অর্থনীতি এই সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক চাপ এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার মুখে ছিল। সরকার দ্রুত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে।

জ্বালানি খাত

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখী উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সৌর ও বায়ুশক্তি প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হয়।

বিনিয়োগ ও শিল্পনীতি

বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করতে একক উইন্ডো সেবা চালু এবং করনীতি সহজীকরণ করা হয়। শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

রপ্তানি খাত

তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং আইটি রপ্তানি খাতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করা হয়। বৈদেশিক বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করা হয়।

ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর

এই সময়ে ডিজিটাল অর্থনীতিকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ই-কমার্স এবং স্টার্টআপ খাতকে বিশেষ সহায়তা প্রদান করা হয়।

সরকার ই-গভর্নেন্স সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভূমি সেবা, কর প্রদান, লাইসেন্সিং এবং নাগরিক সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে। এর ফলে সেবা সহজীকরণ ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়।

প্রশাসনিক সংস্কার ও সুশাসন

প্রশাসনিক কাঠামো আধুনিকায়নে সরকার ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করে। দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি হ্রাসে “শূন্য সহনশীলতা” নীতি বাস্তবায়ন শুরু হয়।

সরকারি দপ্তরে ডিজিটাল ফাইল ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়, যার ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া দ্রুত হয়। একই সঙ্গে সরকারি কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য একটি সুশাসন সূচক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সামাজিক উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ও স্বাস্থ্যখাত

গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল রেফারেল ব্যবস্থা চালু করা হয়। উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং টেলিমেডিসিন সেবা সম্প্রসারণ করা হয়। শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

শিক্ষা ব্যবস্থা

শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটাল ক্লাসরুম, অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম এবং আধুনিক কারিকুলাম উন্নয়ন শুরু করা হয়। শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়।

কর্মসংস্থান

তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা হয়, যেখানে আইটি, ফ্রিল্যান্সিং এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা

নিরাপত্তা বাহিনীর আধুনিকায়ন, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়। শহর ও গ্রামীণ এলাকায় নজরদারি ব্যবস্থা সম্প্রসারণের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি আনা হয়।

নারী ও শিশু নিরাপত্তায় বিশেষ ইউনিট এবং জরুরি হটলাইন চালু করা হয়, যা সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

স্থানীয় সরকার ও বিকেন্দ্রীকরণ

উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। এতে স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি আসে এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ওপর চাপ কমে।

প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক কূটনীতি

প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে নিরাপদ অভিবাসন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দ্রুত রেমিট্যান্স ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়। নতুন শ্রমবাজার খুঁজতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়।বৈদেশিক নীতিতে অর্থনৈতিক

কূটনীতি প্রধান অগ্রাধিকার পায়। আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করা হয়।

পরিবেশ ও জলবায়ু উদ্যোগ

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণ এবং সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের পথ শক্তিশালী করা হয়।

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা

এই অগ্রগতির মধ্যেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ সৃষ্টি করছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ধীরগতিতে অগ্রসর হচ্ছে এবং বৃহৎ পরিসরে চাকরি তৈরি সময়সাপেক্ষ। প্রশাসনিক দুর্নীতি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা এখনো সম্পূর্ণ অর্জিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে, যা নীতি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে। রাজনৈতিক আস্থা স্থায়ী করা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা এখনো একটি চলমান চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে এই ৮৫ দিন মূলত একটি রূপান্তরের শুরু, যেখানে কাঠামো তৈরি হয়েছে কিন্তু পূর্ণ ফলাফল এখনো দৃশ্যমান নয়।

পরিশেষে বলতে যায়,প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ৮৫ দিন বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় এক নতুন দিকনির্দেশনার সূচনা করেছে। এই সময়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং ডিজিটাল রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

এই সময়কাল উন্নয়নের চূড়ান্ত পর্যায় নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা নির্ভর করবে নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনগণের আস্থার ওপর।

লেখক : কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক . প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি , ইমেইল : [email protected]

আমার বাঙলা/আরএ

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

আট বছর ধরে কার্যক্রমে নেই নারায়ণগঞ্জ সিজেএম ভবন

তারিকুর রহমান রিপন ,নারায়ণগঞ্জ: ২০০ কোটি টাকার অধিক ব্যয়ে নির্মিত নারায়ণগঞ...

বোয়ালখালী হারগাজী খাল ভাঙন রোধে ও রাস্তার উন্নয়নের কাজ চলছে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উন্নয়ন ভাবনা ও জনকল্যাণমুখী কর্মসূচির ধারাবাহিকতা...

কালুখালীর  চরাঞ্চলে ইউএনও’র হাস, মুরগী ও ছাগল বিতরন

মঙ্গলবার সকালে রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার নদীবিধৌত চরাঞ্চলের সুফলভোগীদের মাঝে...

নোয়াখালীতে নিজ বাড়ির সামনে জামায়াত কর্মী গুলিবিদ্ধ

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় নিজ বাড়ির সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে মাইনুল ইসলাম ও...

সুন্দরগঞ্জে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের প্রতিবাদী মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান

“অধিকার আদায়ে আমরা সবাই একসাথে” — এই স্লোগানকে সামনে রেখে গ...

কুড়িগ্রাম সদরে জেন্ডার ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মেলা অনুষ্ঠিত

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় জেন্ডার সমতা ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক...

নোয়াখালী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি লিয়াকত, সম্পাদক জাহাঙ্গীর

নোয়াখালী সাংবাদিক ইউনিয়ন (এনইউজে) এর কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। ১২ ম...

রাজবাড়ীতে কাঁচা মরিচের দামে আগুন, সবজির বাজারেও অস্থিরতা

রাজবাড়ীতে কাঁচা মরিচের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। মাত্র এক সপ্তা...

এক শিক্ষকে কয়েক বছর, হুমকিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের উত্তর ধলডাঙ্গা সরকারি প্রাথ...

নবাগত ইউএনও র সাথে সাংবাদিকদের মতবিনিময় ।

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় নবাগত উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে স্থানীয় সাংবাদ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা