তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার পর অবশেষে একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও ফারস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ১০ দফার একটি বিস্তারিত শান্তি পরিকল্পনা পেশ করেছে, যা পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছানো হয়েছে।
এই প্রস্তাবের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে প্রায় ২০ লাখ ডলার ফি আদায় করা। ইরান পরিকল্পনা করেছে, এই আদায়কৃত অর্থ ওমানের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হবে এবং তা যুদ্ধের ফলে দেশটির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে ব্যয় করা হবে। এই সমঝোতার বিস্তারিত আলোচনার জন্য আগামীকাল শুক্রবার (১০ এপ্রিল) পাকিস্তানের ইসলামাবাদে একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
ইরানের পেশ করা ১০ দফা প্রস্তাবের মধ্যে বেশ কিছু কঠোর শর্ত রয়েছে যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও জাতিসংঘ আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়া।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন যুদ্ধসেনা প্রত্যাহার, ইরান ও তার মিত্রদের ওপর সব ধরনের হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা এবং হিমায়িত ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল জানিয়েছে যে, যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তিকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি রেজল্যুশন পাসের শর্তও দেওয়া হয়েছে।
ফারস নিউজ এজেন্সির দেওয়া তথ্যমতে, ইরানের এই ১০ দফা পরিকল্পনায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকারের পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে আগামী দুই সপ্তাহের জন্য ‘সেফ প্যাসেজ প্রোটোকল’ অনুযায়ী সীমিত আকারে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে একটি বিশেষ বিনিয়োগ ও আর্থিক তহবিল গঠনের দাবিও জানিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক শান্তি চুক্তি সম্পাদনের সুযোগ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সব প্রতিরোধ যোদ্ধাদের প্রতি অ-আগ্রাসন নীতি বজায় রাখার বিষয়টিও এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইরানের এই ‘চরমপন্থী’ দাবিগুলো নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ডেমোক্রেটিক সিনেটর ক্রিস মার্ফি সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে বলেছেন যে, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান যদি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায় তবে তা বিশ্বের জন্য এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নমনীয় সুর এবং হামলা স্থগিতের ঘোষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই ১০ দফা প্রস্তাবই কালকের ইসলামাবাদ আলোচনার মূল ভিত্তি হতে যাচ্ছে। যদিও ইরান তাদের শর্তগুলো নিয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে, তবে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে উভয় পক্ষকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছাড় দিতে হতে পারে। আপাতত কালকের এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকের দিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব সম্প্রদায়।
সূত্র: আল জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ান