কখনো কি এমন হয়েছে, সামান্য কোনো ঘটনায় হঠাৎ চোখে পানি চলে এসেছে? পরে হয়তো বুঝেছেন, কান্নাটা আসলে ওই নির্দিষ্ট ঘটনার জন্য নয়; বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা মানসিক চাপ ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ। মানসিক চাপ শরীরের আবেগীয় ও শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়াকে সক্রিয় করে, ফলে কান্নার প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। এটি শুধু দুঃখের কারণে নয়; দীর্ঘ সময় চাপের মধ্যে থাকলে কান্না শরীরের জমে থাকা উত্তেজনা কিছুটা কমানোর একটি স্বাভাবিক উপায় হতে পারে।
মানসিক চাপে কেন কান্না পায়?
মানসিক চাপের সময় কর্টিসলের মতো হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন আসে। এর ফলে আবেগের প্রতি সংবেদনশীলতা বেড়ে যেতে পারে এবং ছোট কোনো ঘটনাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তীব্র মনে হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী চাপের কারণে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশও বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে, ফলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় মানসিক চাপে থাকলে ক্লান্তি তৈরি হয়। এই ক্লান্তি মানুষের আবেগ সামলানোর ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে এমন কোনো ছোট ঘটনা, যা স্বাভাবিক সময়ে সহজেই সামলে নেওয়া সম্ভব, সেটিও হঠাৎ কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক সময় অমীমাংসিত দুশ্চিন্তা, হতাশা বা কষ্ট জমে থাকলেও এমনটা ঘটে।
কান্নার পর অনেকেরই হালকা বা স্বস্তি অনুভূত হয়। এর একটি কারণ হলো কান্নার সময় শরীর ধীরে ধীরে উত্তেজিত অবস্থা থেকে শান্ত অবস্থায় ফিরতে শুরু করতে পারে। শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দনের পরিবর্তনও এই স্বস্তির অনুভূতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে কান্না মানেই যে শরীর থেকে অতিরিক্ত কর্টিসল বা অন্য কোনো ‘স্ট্রেস হরমোন’ বের হয়ে যায়—এমন প্রমাণ যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। বরং গবেষণায় দেখা গেছে, কান্নার সঙ্গে শরীরের শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে শান্ত হওয়ার প্রক্রিয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে।
গবেষণা কী বলছে?
২০২০ সালে Emotion জার্নালে প্রকাশিত একটি র্যান্ডমাইজড ট্রায়ালে ১৯৭ জন নারীকে নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা দেখতে চেয়েছিলেন, কান্না শরীরকে চাপ মোকাবিলায় কতটা সাহায্য করে। অংশগ্রহণকারীদের কেউ দুঃখের ভিডিও দেখে কেঁদেছিলেন, কেউ একই ধরনের ভিডিও দেখেও কাঁদেননি এবং অন্য একটি দল সাধারণ ভিডিও দেখেছিলেন। পরে সবাইকে একটি চাপপূর্ণ ঠান্ডা পানির পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়।
গবেষণায় তিনটি দলের মধ্যে কর্টিসলের মাত্রা বা চাপ সহনশীলতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি। তবে শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরনে পার্থক্য দেখা যায়। যারা কেঁদেছিলেন, তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস তুলনামূলকভাবে স্থির ছিল, যেখানে অন্যদের শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে গিয়েছিল। কান্না শুরু হওয়ার ঠিক আগেও হৃদস্পন্দন ধীর হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
অর্থাৎ, কান্না সবসময় শরীর থেকে স্ট্রেস হরমোন বের করে দেয়—এমন নয়। বরং কান্না আবেগ প্রকাশের পাশাপাশি শরীরকে ধীরে ধীরে শান্ত অবস্থায় ফিরতে সহায়তা করতে পারে।
তাই মন খারাপের সময় চোখে পানি আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি শরীর ও মনের স্বাভাবিক আবেগীয় প্রতিক্রিয়া। তবে যদি দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত কান্না, মন খারাপ বা চাপের অনুভূতি থাকে এবং তা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আমার বাঙলা/ রাব্বি