ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন করে তীব্র লড়াই শুরু হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সরাসরি সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। হুতিদের ওপর সরাসরি বিমান হামলা চালানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ক্রাউন প্রিন্স দুটি পৃথক ফোনালাপে অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু হোয়াইট হাউস সেই আহ্বানে সাড়া দেয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, কেন সৌদি যুবরাজের এই সরাসরি সামরিক সহায়তার অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প?
যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপক সিমন মাবোন সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই সিদ্ধান্তের পেছনের মূল ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণগুলো বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। তার মতে, সৌদি আরবের অনুরোধ উপেক্ষা করার পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে বেশ কিছু বড় বাধা ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করেছে।
হুতি বিদ্রোহীদের প্রধান সহায়তাকারী হিসেবে ইরান নেপথ্যে কাজ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে একটি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে আছে। ট্রাম্প প্রশাসন যখন এই সংঘাত শুরু করেছিল, তখন তাদের ধারণা ছিল এটি মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর ইতিমধ্যে ছয় মাস পার হয়ে যাওয়ার পরও এর কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান বা পরিকল্পনা দিতে ব্যর্থ হয়েছে মার্কিন প্রশাসন। তদুপরি, এই যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এরই মধ্যে ইয়েমেনে নতুন করে আরেকটি ফ্রন্ট বা যুদ্ধক্ষেত্র উন্মুক্ত করলে তা ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য মারাত্মক রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আগামী নভেম্বর মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অথচ নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প বড় গলায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের সব ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে চিরতরে বের করে নিয়ে আসবেন। এমন পরিস্থিতিতে নতুন কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে তা ভোটারদের মাঝে তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সম্প্রতি প্রকাশিত রয়টার্স ও ইপসসের একটি জনমত জরিপে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযানকে সমর্থন করছেন মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিনি, যা ঠিক আগের মাসেও ছিল ৩৭ শতাংশ। অন্যদিকে, ৮৩ শতাংশ নাগরিকের জোরালো মত হলো, এই যুদ্ধ আরও দীর্ঘস্থায়ী ও সর্বনাশা রূপ নিতে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের মাঝে যুদ্ধবিরোধী এই প্রবল মনোভাবের কারণে নতুন কোনো সামরিক অভিযানে জড়ানোর সাহস পাচ্ছে না হোয়াইট হাউস।
পাশাপাশি, আরেকটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা ও রসদ যুক্তরাষ্ট্রের আছে কি না, তা নিয়ে খোদ ওয়াশিংটনের ভেতরেই তীব্র সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে গত জুলাই মাসেই গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, ইরানের সঙ্গে চলমান দীর্ঘায়িত যুদ্ধের কারণে মার্কিন সামরিক ভাণ্ডারে অস্ত্রের মারাত্মক টান পড়েছে। এর মধ্যে আকাশ সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘প্যাট্রিয়ট মিসাইল’ ব্যবস্থা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, যা মার্কিন নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। এছাড়া মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ পরিচালনা করতেই ইতোমধ্যে দেশটির ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ খরচ হয়ে গেছে এবং ডজনখানেক যুদ্ধবিমান ও সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ, আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার চাপ, মার্কিন জনগণের যুদ্ধবিরোধী মনোভাব এবং সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারে রসদের ঘাটতির মতো কঠোর বাস্তবতার কারণেই সৌদি যুবরাজের সরাসরি সামরিক সহায়তার অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া দিতে পারেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আমার বাঙলা/রাজীব