সরকারি কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় পদ্মা নদী থেকে অবাধে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী চক্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদীর গভীর থেকে বালু তোলা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, অস্ত্রধারী বাহিনীর পাহারায় এই বালু বাণিজ্য চললেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার মরিচা ও ফিলিপনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন পয়েন্টে দিন-রাত চলছে বালু কাটার কাজ। এর ফলে পদ্মার স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে তীরের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা তীব্র ভাঙনের শঙ্কা তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে বহু কৃষকের আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ রাইটা-মহিষকুন্ডি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত এই বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে।
বালুঘাট দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এলাকায় নিয়মিত ঘটছে সংঘাত। গত ২০ এপ্রিল দিবাগত রাতে মরিচা ইউনিয়নের মাজদিয়াড় গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ব্রাশফায়ার ও শর্টগানের গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে, যাতে নারীসহ অন্তত ১১ জন গুলিবিদ্ধ হন। চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ জানান, প্রতিবাদ করলেই জোটে হামলা ও মামলার হুমকি। ফলে জানমালের নিরাপত্তায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, মরিচা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান, বিএনপি নেতা বাদল হোসেন ভেগু, টগর মোল্লা, রবিউল ইসলাম এবং সাবেক ইউপি সদস্য লিয়াকত সরদারের নিয়ন্ত্রণে চলছে এই অবৈধ কারবার। এছাড়াও টুকু ও রাসেলের নেতৃত্বে একাধিক পয়েন্টে বালু লুট হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় ইজারা পাওয়া ‘মেসার্স সরকার ট্রেডার্স’ বাঘায় বালু না তুলে অবৈধভাবে দৌলতপুরের সীমানায় বালু উত্তোলন করছে।
প্রতিটি বালুর ট্রলি থেকে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বিজয় নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। প্রতিটি স্টিয়ারিং গাড়ি বালু ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্রটি।
বালু উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা বাদল হোসেন ভেগু ঈদগাহ নির্মাণের অদ্ভুত অজুহাত দেন। তবে সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে 'পরে জানাবেন' বলে মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ গুহ জানান, "পদ্মা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। বালু ও মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসনের অভিযান নিয়মিত চলছে। যারা উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে এই কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
তবে প্রশাসনের এই গতানুগতিক আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারছেন না ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী। তাদের দাবি, লোকদেখানো অভিযান নয়, বরং স্থায়ীভাবে ড্রেজার বন্ধ এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
আমার বাঙলা/আরএ