জুলাই জাতীয় সনদে অবশেষে সই করতে যাচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সনদে সই করার জন্য আজ সোমবার সন্ধ্যা ৬ টায় দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবন যমুনায় যাবে।
আজ বেলা সোয়া একটার পর এনসিপির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এই তথ্য জানানো হয়।
গত বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোট হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে। ‘না’-এর চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ভোট পেয়েছে ‘হ্যাঁ’। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পথ খুলেছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পর এখন জুলাই জাতীয় সনদে সই করতে যাচ্ছে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা তরুণদের গড়া দল এনসিপি। দলটি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারে সক্রিয় ছিল।
এনসিপির পক্ষ থেকে বার্তায় বলা হয়, দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল আজ সন্ধ্যা ছয়টায় জুলাই সনদে স্বাক্ষর করতে যমুনায় যাবে। প্রতিনিধিদলে থাকবেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা সারোয়ার তুষার, মনিরা শারমিন, জাবেদ রাসিন ও জহিরুল ইসলাম মূসা।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের অঙ্গীকার করে। এ লক্ষ্যে ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে। এরপর আরও কয়েকটি খাতে সংস্কারের সুপারিশ করতে কমিশন করা হয়।
প্রথমে গঠন করা ৬ টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে ১৬৬টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম শুরু হয়। ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কমিশনের দীর্ঘ আলোচনা শেষে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়। এগুলো নিয়ে তৈরি করা হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ।
৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। অন্য প্রস্তাবগুলো সরকারি আদেশ, অধ্যাদেশ জারি বা আইন বিধি করে বাস্তবায়ন সম্ভব। বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের কিছু প্রস্তাব ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
কিন্তু সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো অধ্যাদেশ বা কোনো আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। জুলাই জাতীয় সনদে থাকা সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়েই হয়েছে গণভোট। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ১৯টি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব হিসেবে চিহ্নিত করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
গত বছরের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। সেদিন এই সনদে সই করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল ও জোট। পাশাপাশি সনদে সই করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা। পরে আরও একটি দল সনদে সই করে। তবে এনসিপি জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যায়নি। পরেও আর সনদে সই করেনি।
জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগের দিন এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছিলেন, কোনো রাজনৈতিক দল জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর না করলে পরবর্তী সময়ে সই করার সুযোগ থাকবে।
সনদে সই না করার বিষয়ে তখন সংবাদ সম্মেলন করে ৩ টি দাবি জানিয়েছিল এনসিপি। এগুলো হলো জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের খসড়া স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগেই প্রকাশ এবং এই আদেশ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে জারি করতে হবে। জনগণ গণভোটে সনদের পক্ষে রায় দিলে নোট অব ডিসেন্টের (ভিন্নমত) কার্যকারিতা থাকবে না। গণভোটের রায় অনুযায়ী, আগামী নির্বাচিত সংসদ তার ওপর প্রদত্ত গাঠনিক ক্ষমতাবলে সংবিধান সংস্কার করবে এবং সংস্কার করা সংবিধানের নাম হবে ‘বাংলাদেশ সংবিধান, ২০২৬’।
গত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। এই আদেশের অধীন ১২ ফেব্রুয়ারি হয় গণভোট।
আমারবাঙলা/এসএ