শুক্রবার গভীর রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে সমালোচনার মুখে থাকা ফিফা সভাপতি বলেন, ‘সব মতামত মনোযোগ দিয়ে শোনার পর এটা স্পষ্ট হয়েছে যে এই প্রকল্পটি এমন বিভাজন তৈরি করেছে, যা সমর্থনের মাত্রা যাই হোক না কেন, শুরুতে নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে আর সহায়ক নয়। আমাদের উদ্দেশ্য সব সময়ই ছিল সবাইকে একত্রিত করা এবং ফুটবলের উন্নয়ন ঘটানো। সেই লক্ষ্যেই এই প্রস্তাব আর এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে না।’
ইনফান্তিনোর এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো বিরোধিতা আসে উয়েফা, কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) কাছ থেকে। উয়েফা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা হলে বিশ্বকাপসহ ফিফার সব প্রতিযোগিতা বয়কট করবে তাদের ৫৫ সদস্য দেশ।
এর আগে শুক্রবার ইউরোপীয় সময় সকালে দেওয়া এক বিবৃতিতে ফিফা দাবি করেছিল, ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না।’ পাশাপাশি সংস্থাটি জানায়, তারা ‘জনসমক্ষে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগকে স্বীকার ও সম্মান করে’ এবং এ বিষয়ে ‘উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক আলোচনার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছে।’
তবে সেই বিবৃতির কিছুক্ষণ পরই উয়েফা ও উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফের প্রতি সংহতি জানিয়ে আলাদা বিবৃতি দেয় এএফসি।
এরপর ইনফান্তিনো ব্যক্তিগতভাবেও দুটি বড় ধাক্কার মুখে পড়েন। প্রথমত, তার উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো পদত্যাগ করেন। বিদায়ী বিবৃতিতে তিনি পরিকল্পনাটির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, এটি ‘ফিফার সদস্য সংস্থাগুলোর জন্য খারাপ চুক্তি, ফুটবলের জন্য খারাপ চুক্তি এবং খেলাটির দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের জন্যও ক্ষতিকর।’
এরপর ফিফার চিফ অপারেটিং অফিসার কেভিন লামুর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, ইনফান্তিনো তার কর্মীদের সঙ্গে ‘প্রতারণা’ করেছেন এবং এ বিষয়ে মুখ খোলার পর তিনি স্বস্তিতে ঘুমাতে পারবেন, যদিও এর জন্য তাকে চাকরিও হারাতে হতে পারে।
লামুর বলেন, ‘এটা একজন মানুষের প্রকল্প। এই প্রকল্প শুধু এগিয়ে যাওয়াই উচিত না... বরং এখন সময় এসেছে ফুটবলের রাজনৈতিক নেতাদের সঠিক প্রশ্ন করার এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার।’
এই ঘটনাগুলো ইনফান্তিনোকে একেবারে কোণঠাসা করে দেয়। শুক্রবার বিকেলের মধ্যেই সংস্থাটির ভেতরের অনেকেই মনে করছিলেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়নেই অটল থাকবে ফিফা।
জশুয়া কুশনারের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম থ্রাইভ শুক্রবার রাত পর্যন্ত এই চুক্তি থেকে সরে আসেনি। তবে ফিফা নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত বিবৃতির মাধ্যমে পুরো পরিকল্পনা বাতিল করায় সেটা আর কোনো গুরুত্ব বহন করে না।
বিশ্ব ফুটবলের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা মঙ্গলবার জানিয়েছিল, তারা ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজেস’ (এফএফই) নামে একটি নতুন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গঠন করতে চায়। এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বকাপ এবং ক্লাব বিশ্বকাপের মতো প্রধান আয়োজনগুলো পরিচালনা করত। এফএফই-তে বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছে ২১ শতাংশ সংখ্যালঘু অংশীদারিত্ব বিক্রির পরিকল্পনাও ছিল তাদের।
এই বিক্রির মাধ্যমে ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল ফিফার। তাদের দাবি ছিল, নতুন ‘ফিফা ফাস্ট-ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম’ (এফএফএফপি) এর অংশ হিসেবে এই অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ২১১টি সদস্য সংস্থার কাছে ছড়িয়ে দেওয়া যেত।
এই পরিকল্পনার আওতায় আগামী চার বছরে ফিফার মোট উন্নয়ন তহবিল ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেত। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সমালোচনা বাড়লেও ফিফা নিশ্চিত করেছিল, সদস্য সংস্থাগুলো এফএফই পরিকল্পনার বিরোধিতা করলেও যদি প্রস্তাবটি পাস হয়ে যায়, তাহলে বিরোধিতাকারীরাও ২০২৭-৩০ চক্রে ২ কোটি ডলার করে পাবে, যা ২০৩১-৩৪ চক্রে ২ কোটি ২০ লাখ এবং ২০৩৫-৩৮ চক্রে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলারে বাড়ত। এফএফই-তে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে কোনো অংশীদারিত্ব বিক্রি হোক বা না হোক, এই অর্থ পাওয়ার কথা ছিল তাদের।
তবে কোনো সদস্য সংস্থা এফএফই প্রস্তাবে সম্মত হলে, ২০২৭-৩০ সালে তারা পেত ৪ কোটি ডলার, পরবর্তী অর্থ প্রদান একই থাকত।
ফিফার এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া তিনটি ফেডারেশন ফিফার ২১১টি সদস্য সংস্থার মধ্যে ১৩৭টির প্রতিনিধিত্ব করে। ফিফা জানিয়েছিল, এই প্রস্তাব এগিয়ে নিতে হলে তাদের ২১১টি সদস্য সংস্থার সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং ৩৭ সদস্যের ফিফা কাউন্সিলের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এই কাউন্সিলে ইনফান্তিনো এবং ফিফার আটজন সহ-সভাপতিও আছেন।
দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল কনফেডারেশন কনমেবল শুক্রবার শেষ দিকে একটি বিবৃতি দেয়। এতে তারা পরিকল্পনাটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করলেও বলে, আর্থিক ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত ‘সবসময়ই ফুটবলের স্বার্থে কাজ করতে হবে, এর মূল সত্তার ওপর কখনো প্রাধান্য পেতে পারে না।’ এর কয়েক ঘণ্টা পরই ফিফার বিবৃতিতে পুরো পরিকল্পনাটাই বাতিল হয়ে যায়।
দ্য অ্যাথলেটিক জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার উয়েফা এবং কনকাকাফের বৈঠকে ইনফান্তিনোর ফিফার নেতৃত্বে থাকার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেপ ব্লাটারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর থেকে ফিফা প্রেসিডেন্ট পদে আছেন ইনফান্তিনো। ২০২৭ সালের মার্চে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীহীনভাবে জয়ী হবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছিল।
নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট লিসে ক্লাভেনেস ভিজিকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমার স্পষ্ট ধারণা হলো, তিনি অনেক বিশ্বাস হারিয়েছেন। গতবার আমরা তাকে ভোট দিইনি, আর এই বিষয়ে আমরা সন্দিহান ছিলাম। ফিফার অনেক ভালো দিক আছে, তবে শাসন নীতি ও নিয়মের ব্যাপারে যদি শিথিল মনোভাব দেখানো হয়, তাহলে দ্রুতই বিশ্বাস হারিয়ে যায়।’
আমার বাঙলা/ রাব্বি