দলের ভেতরে সুযোগসন্ধানী ও তথাকথিত ‘হাইব্রিড’ নেতাদের অনুপ্রবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে এবং সুবিধাবাদীদের দলে প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি বরিশালে অনুষ্ঠিত বিএনপির এক সাংগঠনিক সভায় দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, গত ১৭ বছরের আন্দোলন, নির্যাতন, গুম, হত্যা ও রাজনৈতিক মামলার মধ্যেও যারা সংগঠনকে টিকিয়ে রেখেছেন, তারাই দলের প্রকৃত শক্তি। তাই কোনো অবস্থাতেই অনুপ্রবেশকারী বা ‘হাইব্রিড’ নেতাদের জন্য দলের দরজা উন্মুক্ত রাখা হবে না।
দলীয় সূত্রের দাবি, সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই বিভিন্ন এলাকা থেকে নতুন মুখের আগমন বেড়েছে। এদের একটি অংশ অতীতে অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও বর্তমানে বিএনপির পরিচয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এসব ব্যক্তি দলের নাম ব্যবহার করে কোথাও কোথাও প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি, দখলদারি এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন। এতে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে থাকা নেতারা উপেক্ষিত হচ্ছেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের মতে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিয়মিত সাংগঠনিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং দল পুনর্গঠনের আগে যাতে অনুপ্রবেশকারীরা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে না পারেন, সে লক্ষ্যেই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, তৃণমূল থেকে পাওয়া বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কেন্দ্র পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
দলের নেতাদের মতে, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের শক্তি নির্ভর করে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের ওপর। যদি সুবিধাবাদীরা নেতৃত্বের সুযোগ পেয়ে যায়, তাহলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয় এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর ক্ষেত্রে সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের প্রবণতা প্রায়ই দেখা যায়। তাই দলের ভাবমূর্তি ও সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখতে এ ধরনের প্রবণতা প্রতিরোধ করা জরুরি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীন দলগুলোর আশপাশে সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে শুরুতেই কঠোর অবস্থান নেওয়া গেলে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা সহজ হয়।
তাদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে এই নির্দেশনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দলীয় শৃঙ্খলা যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের কাছেও ইতিবাচক বার্তা যাবে।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অভিযোগ, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের অনেক নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে, আবার কেউ অনানুষ্ঠানিকভাবে দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিপুলসংখ্যক নতুন কর্মী বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, কুমিল্লা, গাজীপুর, নীলফামারী, পটুয়াখালী, বরিশাল, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ঢাকাসহ কয়েকটি এলাকায় এই প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
বিএনপির একাধিক নেতা মনে করিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন সদস্য গ্রহণে সতর্ক থাকার সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে দলের ভেতরেই প্রশ্ন রয়েছে।
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির বর্তমান লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের মাধ্যমে সংগঠনকে আরও সুসংগঠিত করা। পাশাপাশি যেসব ব্যক্তি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য দলে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় ‘হাইব্রিড’ ইস্যু বিএনপির জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই বার্তা ভবিষ্যৎ দলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।