বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) চলমান বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড সমুন্নত রাখতে কর্তৃপক্ষ ‘ব্যর্থ’ হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
সংস্থাটি বলেছে, এই ‘ব্যর্থতার’ কারণে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া, আইনের শাসন ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মিথ্যা অভিযোগে কারারুদ্ধ করার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউ এসব কথা জানায়।
এইচআরডব্লিউ জানায়, গত ২৭ জুলাই প্রসিকিউটররা মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জমা দিয়েছেন। অভিযুক্তদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনীতিক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং সাংবাদিক রয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়নে ৮০০ জনেরও বেশি নিহতের ঘটনায় এসব বিচার চলছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত বহু অপরাধের জন্য দায়ীদের যথাযথভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত, তবে অনেক বিচারই আন্তর্জাতিক সুষ্ঠু বিচারের মানদণ্ড থেকে পিছিয়ে পড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সংস্কার করে নতুন সরকারের উচিত ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত এবং মনগড়া অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সব সুযোগ বন্ধ করা।’
এক ডজনেরও বেশি মামলা পর্যবেক্ষণ করে ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু অভিযোগ তুলেছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটি বলছে, প্রসিকিউটররা প্রমাণের ন্যূনতম সীমা পূরণ না করে এবং লিখিত কারণ ছাড়াই আসামিদের মাসের পর মাস আটকে রাখা হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সাক্ষীদের জবানবন্দি নিয়ে। এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তাদের রেকর্ড করা একাধিক জবানবন্দিতে ‘কাট-অ্যান্ড-পেস্ট’ বা হুবহু নকল করা অংশের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা প্রমাণের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে। উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রামের একটি হত্যা মামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই মামলার ৫৫টি সাক্ষীর জবানবন্দি প্রকাশ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি জবানবন্দিতে হুবহু একই ৬ লাইনের একটি অংশ এবং ৯টিতে আরও দীর্ঘ একটি অভিন্ন অংশ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে মোজাম্মেল বাবু এবং ফারজানা রূপার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ কভারেজের জেরে গত ১৪ মে তাঁদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। ২৭ জুলাই জমা দেওয়া অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। এইচআরডব্লিউ বলছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করার উদ্দেশ্যকে গণহত্যা বলা হলেও, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা এবং গ্রেপ্তারের কোনো লিখিত ব্যাখ্যা না দেওয়া আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
ট্রাইব্যুনালের বিচার ব্যবস্থায় আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সাক্ষীদের জেরা করার ক্ষমতা সীমিত বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এছাড়া, চট্টগ্রামের এক প্রবীণ রাজনীতিবিদ এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর জামিন নিশ্চিত করতে এক প্রসিকিউটরের এক কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশের পর ওই প্রসিকিউটর পদত্যাগ করলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই আগামী ৬ আগস্ট ওই মামলার বিচারকাজ শুরুর কথা রয়েছে।
এইচআরডব্লিউ জানায়, হাসিনা সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনাল এখন পর্যন্ত ৬টি বিচার সম্পন্ন করেছে। এতে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ৬২ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে স্বয়ং হাসিনাসহ ৪২ জনের বিচারই হয়েছে অনুপস্থিতিতে (ইন অ্যাবসেনশিয়া)। এসব অভিযোগে মোট ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আমার বাঙলা/ হুমায়রা