ছবি: সংগৃহিত
জাতীয়

রাষ্ট্রপতি ভোটে নতুন কৌশলে বিএনপি

খোন্দকার নিয়াজ ইকবাল

আসন্ন ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি এবার প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। অতীতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় আনুগত্য, দক্ষতা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা নিয়ে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার আলোকে দলটি এবার এমন একজন ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিতে চায়, যিনি একই সঙ্গে যোগ্য, সাহসী, গ্রহণযোগ্য এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিপক্ব হবেন। এ বিষয়েই আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক।

দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং সম্ভাব্য প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া। গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিতব্য এই সভায় সভাপতিত্ব করবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভায় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা উপস্থিত থাকবেন।

সম্প্রতি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী জানান, রাষ্ট্রপতি পদে এমন একজন ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে, যিনি সর্বস্তরে সম্মানিত, বিচক্ষণ, অভিজ্ঞ এবং দেশের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। তার ভাষ্য, দল এমন একজন রাষ্ট্রপ্রধান চায়, যিনি জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন।

রিজভী আরও বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বর্তমান নেতৃত্ব যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তার ভিত্তিতেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি দাবি করেন, দলের নেতৃত্ব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যথাযথ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন বৈঠক করেছেন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আগামী সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনেই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে। ফলে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবার বিএনপি শুধু দলীয় আনুগত্যকে নয়, প্রার্থীর প্রশাসনিক দক্ষতা, বিচক্ষণতা এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে চায়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দলটি এমন একজন রাষ্ট্রপতি খুঁজছে, যিনি প্রয়োজনে দৃঢ় ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হবেন।

দলীয় আলোচনায় তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রথমত, দেশ ও দলের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা; দ্বিতীয়ত, প্রার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা; এবং তৃতীয়ত, জাতীয় সংকটে দৃঢ় নেতৃত্ব প্রদানের মানসিকতা। অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকেই এই মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

অতীতের উদাহরণ টেনে অনেকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের সময়ে দৃঢ় অবস্থানের কারণে একটি সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। আবার অন্যদিকে, ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে না পারায় সেই সময়ের সংকট আরও গভীর হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত এক-এগারোর জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে এমন একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন করা উচিত, যিনি সততা, মর্যাদা, গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে অনন্য। তার মতে, অতীতের রাষ্ট্রপতিদের অনেকের যোগ্যতা ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তাই ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে এমন একজন রাষ্ট্রপতিকে বেছে নেওয়া প্রয়োজন, যিনি জাতির প্রধান নাগরিক হিসেবে সর্বস্তরের মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবেন।


রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কখনোই কেবল রাজনৈতিক সমীকরণ বা দলীয় সুবিধা বিবেচনা করে হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও জাতীয় সংকট, সাংবিধানিক জটিলতা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তার ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমন একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন করা উচিত, যিনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে সংবিধান, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন। তিনি মনে করেন, জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক চর্চা আরও শক্তিশালী হবে।

এদিকে, বিএনপির অতীত অভিজ্ঞতার আলোচনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নামও উঠে আসে। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর তাকে প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে রাষ্ট্রপতি করা হলেও পরবর্তী সময়ে দল ও তার মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত বিএনপির প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কয়েকটি সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিএনপির সঙ্গে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর দূরত্ব বাড়তে থাকে। এর জেরে ২০০২ সালে দলীয় পর্যায়ে তার বিরুদ্ধে সাংবিধানিক পদক্ষেপ নেওয়ার আলোচনা শুরু হলে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তার রাজনৈতিক অবস্থান বিএনপির নীতির সঙ্গে ভিন্নমুখী ছিল বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক প্রবীণ নেতা মনে করেন, রাষ্ট্রপতির পদকে কেবল আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার ভাষায়, অতীতের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে ভুল ব্যক্তি নির্বাচিত হলে রাজনৈতিক সংকট আরও জটিল হতে পারে। তাই এবার এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেওয়ার বিষয়ে দল গুরুত্ব দিচ্ছে, যিনি সংকটময় পরিস্থিতিতে বিচক্ষণতা, দক্ষতা ও দৃঢ় নেতৃত্বের পরিচয় দিতে সক্ষম হবেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু নতুন রাষ্ট্রপ্রধান বাছাইয়ের বিষয় নয়; এটি ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

অন্যদিকে, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মতে, দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে এমন একজন ব্যক্তির আসীন হওয়া উচিত, যিনি সত্যিকার অর্থেই জাতির অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারবেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে যে নীতিগত দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে, তা অনুসরণ করা হলে রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়তে পারে। তবে বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোতে নির্বাচন আগের নিয়মেই হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অতীতের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও বিতর্ক থেকে শিক্ষা নিয়েই বিএনপি এবার রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে। দলটি এমন একজন প্রার্থী চায়, যাকে ঘিরে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের সুযোগ কম থাকবে এবং যিনি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে সর্বজনগ্রাহ্য ভূমিকা রাখতে পারবেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছরে ২২ জন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময়ে কেউ বিতর্কের মুখে পদত্যাগ করেছেন, আবার কেউ রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে ক্ষমতা হারিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতিদের ভূমিকা, নিরপেক্ষতা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের সেই অভিজ্ঞতাগুলোই বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে এবং এবার প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে অধিক সতর্ক থাকতে উদ্বুদ্ধ করছে।

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

তিন দিনের ব্যবধানে বাড়ল স্বর্ণের দাম

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) আবারও দে...

প্রতিশ্রুতি পূরণে এগিয়ে এমপি মোশাররফ

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নতুন করে ‘১৩ নম্বর হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদ’ গঠন...

বিএনপির ক্ষমতা গ্রহণকে 'ইতিবাচক' আখ্যা ভারতের

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বিজয় এবং দলটির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের...

জাতিসংঘে প্রথমবার ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্...

ডেটা প্যাকেজের দাম কমানোর আহ্বান মন্ত্রীর

নেটওয়ার্কের মান, কল ড্রপ এবং মোবাইল ডেটা প্যাকেজের দাম পুনর্মূল্যায়ন করে কমা...

পজেটিভ পিরোজপুরে হাবিব-নাঈমের নেতৃত্ব

অরাজনৈতিক ও অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘পজেটিভ পিরোজপুর’-এর ২০২৬...

২৪ ঘণ্টায় ডিএমপির অভিযানে গ্রেপ্তার ৪৩১

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় পরিচালিত ঢাকা...

বাংলাদেশ সফরে আসছেন মার্কিন বিনিয়োগকারীরা: সার্জিও গোর

মার্কিন ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা দেখছেন। এ লক্ষ্যেই খুব...

শাহরুখের ‘কিং’ ঘিরে নতুন চমক 

বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খানের আসন্ন সিনেমা ‘কিং&...

মায়ের দুধ: শিশুর পূর্ণাঙ্গ পুষ্টির উৎস

বিশ্বজুড়ে আজ ১ আগস্ট পালিত হচ্ছে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা