ছবি: সংগৃহীত
মতামত

সাঈদ-উর রহমান: শিক্ষার্থীর মর্যাদায় আস্থার শিক্ষক

ড. মাহরুফ চৌধুরী

কোনো শিক্ষকের কথা মনে পড়লে সাধারণত তাঁর পড়ানো কোনো তত্ত্ব, বিশেষ কোনো বক্তৃতা কিংবা পরীক্ষার জন্য দেওয়া নোট সবার আগে মনে পড়ে না; মনে পড়ে তাঁর আচরণ। শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি কীভাবে দেখেছেন, কেমন ব্যবহার করেছেন, কীভাবে সম্বোধন করেছেন—এসবই দীর্ঘদিন মনে থেকে যায়। মনে থাকে তাঁর কথাবার্তার ধরন, মুখাবয়ব, দেহভঙ্গি কিংবা কত সহজে তিনি শিক্ষার্থীকে আপন করে নিতে পারতেন। অর্থাৎ একজন শিক্ষকের সহজ, স্বাভাবিক অথচ গভীর মানবিক আচরণই অনেক সময় তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ-উর রহমান (১৯৪৮-২০২৬) ছিলেন তেমনই একজন শিক্ষক। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন অনন্তলোকে। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর হারিয়েছে একজন বিশিষ্ট গবেষক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষককে। তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে তাঁর গবেষণা, প্রবন্ধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের কথা অবশ্যই আলোচিত হবে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা, জীবনী, প্রকাশনা কিংবা পুরস্কারের তালিকা দিয়ে তাঁকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ শুধু তিনি কী লিখেছেন বা কী গবেষণা করেছেন, তা নয়; বরং তিনি কেমন মানুষ ছিলেন এবং তাঁর সংস্পর্শে এসে শিক্ষার্থীরা কী শিখেছে—এই প্রশ্নটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভাবীকালের শিক্ষকদের জন্য তাঁর জীবন কতটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, সেটিও বিবেচনার বিষয়।

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য শিক্ষক থাকেন। কেউ জ্ঞানের গভীরতার জন্য, কেউ বক্তৃতার দক্ষতার জন্য, কেউ গবেষণার জন্য, কেউ ব্যক্তিত্বের কারণে, আবার কেউ প্রশাসনিক ক্ষমতা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকেন। কিন্তু খুব কম শিক্ষক আছেন, যাঁদের কথা মনে পড়লে কোনো নির্দিষ্ট ক্লাস বা পাঠের চেয়ে আগে একটি চরিত্র ও জীবনদর্শন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সাঈদ-উর রহমান ছিলেন তেমনই একজন।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অতিরিক্ত সখ্যের নয়; বরং সম্মান ও আস্থার এক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক। তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থীর স্মৃতিতে সম্ভবত সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে দুটি শব্দ—‘আপনি’ ও ‘ভাই’। একজন অধ্যাপক তাঁর ছাত্রকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করছেন, আবার সাধারণ একজন মানুষকে ‘ভাই’ বলে ডাকছেন—এই আপাত-সাধারণ আচরণের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তাঁর শিক্ষকতার গভীর দর্শন।

মানুষকে তাঁর জন্ম, বর্ণ, ধর্ম, পদ-পদবি, পেশা কিংবা আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে একজন মানুষ হিসেবে দেখা এবং তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া—এটাই ছিল তাঁর আচরণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

প্রাক্তন ছাত্র সরকার আমিন তাঁর স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই সাঈদ-উর রহমান তাঁকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। গ্রাম থেকে প্রথমবার ঢাকায় আসা সেই তরুণের কাছে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের মুখে ‘আপনি’ শোনা ছিল বিস্ময়কর। তাঁর ভাষায়, এই সম্বোধন তাঁকে একই সঙ্গে বিস্মিত, সম্মানিত ও সম্মোহিত করেছিল।

এই স্মৃতির তাৎপর্য কেবল একটি সর্বনামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যেই নিহিত ছিল সাঈদ-উর রহমানের শিক্ষকতার দর্শন। তিনি তাঁর ছাত্রকে অধস্তন হিসেবে দেখেননি; দেখেছিলেন একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে, যার নিজস্ব মর্যাদা রয়েছে।

প্রচলিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কে একটি স্বাভাবিক দূরত্ব থাকে। শিক্ষক পড়ান, শিক্ষার্থী শেখে; শিক্ষক মূল্যায়ন করেন, শিক্ষার্থী মূল্যায়িত হয়। এই কাঠামোর মধ্যে কর্তৃত্ব কখনো কখনো ভয়ের রূপ নিতে পারে। কিন্তু সাঈদ-উর রহমান স্বাভাবিক দূরত্ব বজায় রেখেও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ককে মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলেছিলেন।

তাঁর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে দূরত্ব ছিল, কিন্তু বিচ্ছিন্নতা ছিল না; শ্রদ্ধা ছিল, কিন্তু ভীতি ছিল না। তিনি অযথা কাউকে কাছে টানতেন না, আবার প্রয়োজনের সময় কাউকে একা ছেড়ে দিতেন না। তাঁর উপস্থিতি ছিল নীরব, কিন্তু আস্থাশীল। আর একজন শিক্ষকের জন্য এই আস্থাই বড় শক্তি। কর্তৃত্ব দিয়ে আনুগত্য পাওয়া যায়, কিন্তু আস্থা অর্জন করতে হয় আচরণ, চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে।

সাঈদ-উর রহমান শিক্ষার্থীদের ওপর নিজের গুরুত্ব চাপিয়ে দেননি। বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যেখানে শিক্ষার্থী তাঁর কাছে নিজের কথা বলতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারে। তাঁর কাছে শিক্ষকতা শুধু পাঠদানের সম্পর্ক ছিল না; ছিল শিক্ষার্থীকে একজন মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ারও সম্পর্ক।

মানুষকে মর্যাদা দেওয়ার এই প্রবণতা শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সরকার আমিনের স্মৃতিচারণে জানা যায়, একদিন রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা সাঈদ-উর রহমান একজন রিকশাচালককে বলেছিলেন, ‘ভাই, যাবেন?’ রিকশাচালক প্রথমে অবাক হয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করেছিলেন, তাঁকে আসলে কাকে ডাকা হচ্ছে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক তাঁকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করছেন—এটি তাঁর কাছে যেন বিশ্বাস করার মতো বিষয় ছিল না।

এই ছোট্ট ঘটনাটিও তাঁর জীবনদর্শনের বড় পরিচয় বহন করে। আমরা প্রায়ই সাম্য, মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলি। কিন্তু এসব মূল্যবোধের প্রকৃত পরীক্ষা হয় আমাদের দৈনন্দিন আচরণে—আমরা একজন শ্রমজীবী মানুষকে কীভাবে সম্বোধন করি, একজন শিক্ষার্থীকে কীভাবে দেখি, অপেক্ষাকৃত দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করি কিংবা ভিন্নমতের মানুষের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল থাকি।

সাঈদ-উর রহমানের বিশেষত্ব ছিল, তিনি যে মূল্যবোধে বিশ্বাস করতেন, তা বক্তব্যের চেয়ে তাঁর আচরণেই বেশি দৃশ্যমান ছিল। ‘আপনি আচরি ধর্ম পরে শেখাও’—এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ যেন তাঁর জীবনেই দেখা গেছে। তিনি মানুষকে মর্যাদা দেওয়ার তত্ত্ব শুধু পড়াননি; নিজের আচরণ দিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে একজন মানুষকে মর্যাদা দিতে হয়।

স্বভাবতই স্বল্পভাষী সাঈদ-উর রহমান কোনো আড্ডা কিংবা সভার কেন্দ্রবিন্দু হতে চাইতেন না। উচ্চকণ্ঠ সামাজিক কিংবা একাডেমিক বিতর্কেও তাঁকে সচরাচর দেখা যেত না। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের অনেকের স্মৃতিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল নীরব, কিন্তু দৃঢ় ও স্পষ্ট।

তাঁর এই নীরবতা নিষ্ক্রিয়তা ছিল না; বরং ছিল আত্মসংযমের প্রকাশ। নিজের কাজ, দায়িত্ব ও পেশাগত নৈতিকতার প্রতি তাঁর ছিল গভীর আস্থা। গবেষণা করেছেন, লিখেছেন, শিক্ষকতা করেছেন এবং নিজের সাধ্য অনুযায়ী মানুষকে সাহায্য করেছেন। নিজের গুরুত্ব প্রচারের কোনো প্রয়োজন তিনি অনুভব করেননি। এখানেই তাঁর শিক্ষকসত্তার একটি বড় সৌন্দর্য।

বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণা ও পাঠদান করলেও তাঁর মনোজগত ছিল বহুমাত্রিক। পূর্ব বাংলার রাজনীতি, সংস্কৃতি ও কবিতা, বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজচিন্তা ও মার্কসবাদসহ নানা বিষয় তাঁর চিন্তা ও অনুসন্ধানের অংশ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যোদ্ধাদের রাজনৈতিক প্রশিক্ষক হিসেবেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।

সাহিত্য তাঁর কাছে নিছক নান্দনিকতার বিষয় ছিল না; ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের জীবন বোঝারও একটি মাধ্যম ছিল। জীবনকে বৃহত্তর পরিসরে দেখার এই সক্ষমতা তাঁকে কেবল একটি নির্দিষ্ট একাডেমিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি।

রাজনৈতিকভাবেও তিনি ছিলেন সক্রিয় ও স্পষ্ট অবস্থানের মানুষ। মাওলানা ভাসানীর সমাজতান্ত্রিক ধারা, বৈষম্যহীন সমাজ, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবমুক্তির প্রশ্ন তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল। একই সঙ্গে দেশ ও মানুষের কল্যাণে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তার প্রতিও তাঁর বিশ্বাস ছিল। তবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান উচ্চকণ্ঠ স্লোগান কিংবা ব্যক্তিগত আনুগত্যের প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেও তিনি নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা বজায় রেখেছিলেন।

একজন বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব শুধু একটি মতাদর্শের পুনরাবৃত্তি করা নয়; নিজের বিশ্বাসকে যুক্তি, তথ্য, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার আলোকে যাচাই করাও তাঁর দায়িত্ব। সাঈদ-উর রহমানের জীবন থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো—দৃঢ় অবস্থান ও সংযত প্রকাশ পরস্পরের বিরোধী নয়।

তিনি উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না, কিন্তু অবস্থানহীনও ছিলেন না। তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি শুধু কথার উচ্চতায় নয়, আচরণ ও জীবনচর্চার মধ্যেও প্রকাশ পেয়েছে। ন্যায়, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা কিংবা মানবমুক্তির কথা বলা সহজ; কঠিন হলো সেগুলো নিজের জীবন ও আচরণে ধারণ করা। সাঈদ-উর রহমান সেই কঠিন কাজটি করে গেছেন।

তাঁর ছাত্রদের কাছে তাই তিনি শুধু একজন বিষয়জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষক ছিলেন না; ছিলেন মূল্যবোধের এক জীবন্ত উদাহরণ।

জীবনের শেষদিকে তিনি দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। ব্যক্তিগত কষ্টকে তিনি প্রকাশ্যে আলোচনার বিষয় করতে চাননি। মৃত্যুর পরও তাঁর প্রচারবিমুখ চরিত্রের যেন একটি প্রতিফলন দেখা গেল। বাংলা একাডেমি ও বাংলা বিভাগের পক্ষ থেকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর আগ্রহ থাকলেও পারিবারিক সিদ্ধান্তে তা সম্ভব হয়নি বলে জানা যায়। তাঁর বিদায়ও তাই অনেকটা নীরবেই হলো।

যে মানুষটি জীবনভর নিজের উপস্থিতিকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেননি, তাঁর বিদায়ও যেন সেই চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু নীরব বিদায় তাঁর প্রভাবকে মুছে দিতে পারে না। বরং তাঁর মৃত্যুর পরই হয়তো আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে, একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে কতটা গভীর ছাপ রেখে যেতে পারেন।

তাঁর কোনো বক্তৃতার প্রতিটি কথা হয়তো সবাই মনে রাখবেন না, কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার সূত্রও সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু মনে থাকবে তাঁর ‘আপনি’ সম্বোধন, মনে থাকবে তাঁর ‘ভাই’ ডাক, মনে থাকবে তাঁর মৃদু হাসি এবং একজন মানুষকে ছোট না করে সম্মান করার বাস্তব শিক্ষা।

আজ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, মূল্যবোধ, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি। এমন সময়ে সাঈদ-উর রহমানের জীবন নতুন করে ভাবতে শেখায়—একজন শিক্ষককে শুধু জ্ঞানের বাহক হলেই চলে না; তাঁকে আচরণেও মানবিকতার উদাহরণ হতে হয়।

বড় শিক্ষক হওয়া মানে শুধু বড় গবেষক হওয়া নয়। বেশি প্রকাশনা, পুরস্কার কিংবা পদ-পদবিও তার একমাত্র মাপকাঠি নয়। বড় শিক্ষক সেই ব্যক্তি, যিনি শিক্ষার্থীর চিন্তার স্বাধীনতাকে সম্মান করেন, প্রশ্ন করার সাহস জাগান, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করতে শেখান এবং নিজের আচরণ দিয়ে মানুষকে মর্যাদা দেওয়ার শিক্ষা দেন।

এই কারণে সাঈদ-উর রহমানকে শুধু স্মরণসভা, শোকবার্তা কিংবা স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তাঁর জীবনকে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে—এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে শিক্ষক হবেন জ্ঞানের পাশাপাশি নৈতিকতারও পথপ্রদর্শক; শিক্ষার্থী হবে কেবল পরীক্ষার্থী নয়, মর্যাদাসম্পন্ন স্বতন্ত্র মানুষ; বিতর্ক থাকবে, কিন্তু অবমাননা নয়; গবেষণা থাকবে, কিন্তু আত্মপ্রদর্শনের চেয়ে সত্যের অনুসন্ধান হবে বড়।

একজন শিক্ষক শুধু তাঁর সময়ের শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করেন না; তাঁর মূল্যবোধ, নৈতিক সাহস ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেরণা শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়ে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজ তাই একটি জাতির চিন্তার সংস্কৃতি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সাঈদ-উর রহমানের সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্মারক কোনো ভবন, ফলক কিংবা আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা নাও হতে পারে। তাঁর সবচেয়ে বড় স্মৃতিসৌধ হতে পারে এমন এক প্রজন্মের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, যারা মানুষকে তার ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক পরিচয়ের আগে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখবে।

তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে তখনই, যখন আমরা তাঁর জীবনের সহজ অথচ কঠিন পাঠ নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারব—ভিন্নমতকে সম্মান করা, দুর্বলকে ছোট না করা, শিক্ষার্থীকে অধস্তন হিসেবে না দেখা এবং নিজের বিশ্বাসকে নিজের আচরণে সত্য করে তোলা।

সাঈদ-উর রহমান স্যার তাঁর দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত সফর শেষে মিশে গেছেন সময়ের অনন্ত স্রোতে। কিন্তু তাঁর শেখানো ‘আপনি’ শব্দটি আমাদের জন্য এখনও একটি নৈতিক আহ্বান। মানুষকে ‘আপনি’ বলা শুধু ভাষার ভদ্রতা নয়; তার মর্যাদাকে স্বীকার করা। একজন রিকশাচালক কিংবা প্রান্তিক মানুষকে ‘ভাই’ বলা শুধু সৌজন্য নয়; সামাজিক দূরত্বের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা।

একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্মানের সম্পর্ক তৈরি করা শুধু ভালো শিক্ষকতার লক্ষণ নয়; ভবিষ্যৎ নাগরিকের মানবিক বোধ গড়ে তোলারও অংশ। শিক্ষক হিসেবে সাঈদ-উর রহমান এই কাজটি নীরবে করে গেছেন তাঁর পুরো পেশাজীবনে।

এখন আমাদের দায়িত্ব তাঁর সেই নীরব শিক্ষাকে উচ্চকণ্ঠ স্লোগানে নয়, জীবনের আচরণে বহন করা। সম্ভবত একজন শিক্ষকের জন্য এর চেয়ে বড় উত্তরাধিকার আর কিছু হতে পারে না।

কালের পরিক্রমায় শিক্ষার্থীরা তাঁর সব কথা হয়তো মনে রাখবে না; কিন্তু তাঁর কাছ থেকে পাওয়া মর্যাদা, সম্মান এবং অন্য মানুষকে সম্মান করার শিক্ষা অম্লান থেকে যাবে। সাঈদ-উর রহমান স্যারের প্রতি সবচেয়ে যথার্থ শ্রদ্ধাঞ্জলি হবে এমন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর প্রজন্ম তৈরি করা, যারা পাণ্ডিত্যে সমৃদ্ধ, চিন্তায় স্বাধীন, আদর্শে দৃঢ়, আচরণে বিনয়ী এবং মানুষের মর্যাদার প্রশ্নে সচেতন।

একজন শিক্ষক হয়তো একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বদলে দিতে পারেন; আর একটি মানবিক বিশ্ববিদ্যালয়ই পারে একটি জাতির চিন্তা ও চরিত্রকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে।

আমার বাঙলা/ রাব্বি

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

মনোহরদীতে গাঁজা সেবনের অভিযোগে যুবকের ১০ মাসের কারাদণ্ড

নরসিংদীর মনোহরদীতে গাঁজা সেবন করে উচ্ছৃঙ্খল আচরণের অভিযোগে সুমন আহমেদ (৩৫) না...

ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম ও সম্পাদক ইনানের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগে...

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শহীদ সেনাসদস্যদের পরিবারের সাক্ষাৎ

চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ট্যাংক ফায়ারিংয়ের সময় গোলা বিস্ফোর...

ইউপি ভোটের তারিখ ঘোষণা নিয়ে সরকার জানে না: মীর শাহে আলম

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকা...

রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের বার্তা কিম জং উনের

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে পাঠানো এক বার্তায় উত্তর কোরিয়ার সর...

উপজেলা-ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জরুরি নির্দেশনা

মাঠ পর্যায়ে ভূমি সেবা আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করতে দে...

খুলনায় ডেঙ্গু-হামের উপসর্গে ২ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ৪৪৯

খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু ও হামের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ডে...

স্বাস্থ্য পরীক্ষায় মালয়েশিয়া যাচ্ছেন মির্জা আব্বাস

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস...

পূর্ণিমা: জীবনে উত্থান-পতন আসবেই, ভেতরের ঝড়কে উজ্জ্বল হতে দিও না

ঢালিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী দিলারা হানিফ পূর্ণিমা জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত &l...

‘ধুরন্ধর’ নিয়ে নীরবতা ভাঙলেন শাহরুখ

বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছেন তাঁর বহুল প্রতীক্ষিত সি...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা