ইসরায়েলি হামলা ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে লড়াই করছেন গাজার বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো। মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় একটি তাঁবুতে বসবাস করছেন খাদিজা আবু কাদোস ও তার পরিবার। প্রতিদিনের মতো সেখান থেকেই ১১ বছর বয়সী মেয়ে জুরিকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করেন তিনি।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে গাজার উত্তরাঞ্চলের শেখ রাদওয়ান এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় তাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর থেকে পরিবারটি দেইর আল-বালাহর একটি বাস্তুচ্যুত শিবিরে বসবাস করছে।
জুরি ও তার ১৪ বছর বয়সী বোন রিতাজ যে স্কুলে পড়ে, সেই এলিয়া স্কুলের শ্রেণিকক্ষও তৈরি হয়েছে তাঁবু দিয়ে। সেখানে পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল নেই। অনেক সময় শিশুরা মেঝেতে বিছানো ম্যাট ও কার্পেটের ওপর বসে পড়াশোনা করে। গরমের মধ্যে নেই কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা পর্যাপ্ত পাখা। ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের কারণে গাজার হাজার হাজার শিশুর মতো জুরি ও তার ভাই-বোনেরাও দীর্ঘ সময় স্কুলের বাইরে ছিল। ইন্টারনেট সমস্যার কারণে অনলাইন ক্লাস করাও ছিল কঠিন।
বর্তমানে জুরি ও তার দুই ভাই-বোন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকদের পরিচালিত একটি স্কুলে পড়ছে। স্কুলটি তাদের শিবিরের কাছেই অবস্থিত এবং মাসে ৩০ শেকেল (প্রায় ৮ ডলার) ফি নেয়। তবে খাবার, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর এই সামান্য ফিও পরিবারের জন্য বড় চাপ।
খাদিজা বলেন, সামর্থ্য থাকলে তিনি সন্তানদের বেসরকারি স্কুলে পাঠাতেন। যুদ্ধের আগে তার মেয়েরা গাজা শহরের জাতিসংঘ পরিচালিত একটি স্কুলে পড়ত। সেখানে তারা ভালো ফল করত এবং শিক্ষকদের প্রশংসা পেত।
এখন তাঁবুর মধ্যে সন্তানদের পড়াশোনা করতে দেখে কষ্ট পান তিনি। তবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও শিক্ষকরা শিশুদের হারানো পড়াশোনা কিছুটা পূরণ করার চেষ্টা করছেন।
খাদিজা বলেন, “এখানকার পড়ানো ভালো। কিন্তু আমার সন্তানদের এই পরিস্থিতিতে পড়তে দেখে খারাপ লাগে। এখানে চেয়ার নেই, ঠিকমতো বসার জায়গা নেই। এটি কোনো স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ নয়।”
তিনি আরও বলেন, স্কুলের খাতা-কলম কেনাও কঠিন হয়ে গেছে। একটি খাতার দাম এখন চার থেকে ছয় শেকেল পর্যন্ত।
গাজায় দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভয়াবহ সংকটে ফেলেছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, চার থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় সাত লাখ শিশু দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারেনি।
গাজার অধিকাংশ স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাত্র অল্প কিছু স্কুল ভবন অক্ষত রয়েছে, আর অধিকাংশ স্কুলের বড় ধরনের সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন।
ইসরায়েলি হামলার ঝুঁকিও এখনো কাটেনি। যুদ্ধবিরতির পরও বহু শিশু নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংস্থা। সম্প্রতি পশ্চিম গাজায় স্কুল থেকে ফেরার পথে গাড়িতে হামলায় আট বছর বয়সী ওয়াফা আকিলা ও তার বাবা নিহত হন।
শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে তাঁবু ও অস্থায়ী স্থানে স্কুল চালু করেছেন। ১০ বছর শিক্ষকতা করা নোহা খাদরা চলতি বছরের জানুয়ারিতে এলিয়া স্কুল চালু করেন। স্কুলটি গাজার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।
এই স্কুলে শিশুরা তাঁবুর নিচে পড়াশোনা করে। পর্যাপ্ত ডেস্ক-চেয়ার নেই, নেই প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণও। তবুও এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১০০-এর বেশি শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হয়েছে। তাদের পড়ানোর জন্য রয়েছেন মাত্র ৪০ জন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক ও কর্মী।
নোহা খাদরা জানান, শুরুতে শিশুদের বসার জন্য কোনো টেবিলও ছিল না। তারা ম্যাটের ওপর বসে ক্লাস করত। অনেক শিক্ষার্থীর খাতা-কলম না থাকায় শিক্ষকরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তা কিনে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, স্কুলের বর্তমান পরিবেশ কষ্টদায়ক হলেও শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ দিতে এই উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
গাজার বেসরকারি স্কুলগুলোর পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হলেও উচ্চ খরচের কারণে অনেক পরিবারের জন্য এসব স্কুলে সন্তানদের পড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
২৫ বছর বয়সী জাহরা সালেহ তার দুই সন্তানকে গাজা শহরের পশ্চিমাঞ্চলের একটি বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করেছেন। স্বামীর চাকরি না থাকায় মাসে ৪০০ শেকেল স্কুল ফি দেওয়া তার পরিবারের জন্য কঠিন। তবুও সন্তানদের আর পড়াশোনা থেকে দূরে রাখতে চাননি তিনি।
জাহরা বলেন, “আমি খুব কঠিন আর্থিক অবস্থার মধ্যে আছি। সন্তানদের ফি কমানোর জন্য আমাকে স্কুলে কাজ করতে হয়েছে।”
গাজার শিক্ষা সংকট তৈরি হয়েছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে। যুদ্ধের কারণে শ্রমবাজার প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
বেসরকারি স্কুলগুলোর অনেক পরিচালকও পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে ফি কমিয়ে দিচ্ছেন। তাদের মতে, অর্থের অভাবে কোনো শিশুর শিক্ষা বন্ধ হওয়া উচিত নয়।
যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও গাজার শিক্ষক ও অভিভাবকেরা শিশুদের ভবিষ্যৎ ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তবে পর্যাপ্ত সহায়তা ছাড়া এই লড়াই চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
আমার বাঙলা/রাজীব