রাজধানীর যানজট কমিয়ে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ এগিয়ে চললেও প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। শুরুতে প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে যে অর্থ বরাদ্দ ধরা হয়েছিল, বর্তমানে সেই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রকল্পের প্রাথমিক হিসাবে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৭০৪ কোটি টাকা। কিন্তু নির্মাণ শুরুর তিন বছর আট মাসের মধ্যেই তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪২৩ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় এখন ২৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। ফলে আগের তুলনায় প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্মাণকাজ শেষ করতে গিয়ে ভবিষ্যতে ব্যয়ের আরও কিছু পরিবর্তন হতে পারে।
তবে ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোচ্ছে নির্মাণকাজও। গত জুন পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭১ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, ধাপে ধাপে বিভিন্ন অংশ যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা।
প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধউর মোড় থেকে আশুলিয়া বাজার পর্যন্ত প্রায় ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটার এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে দুটি পৃথক দুই লেনের সার্ভিস লেন সেতু। তুরাগ নদীর পানি প্রবাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এই কাঠামোর নকশা করা হয়েছে।
প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে দেখা গেছে, সার্ভিস লেনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। সড়কে পিচ ঢালাইও সম্পন্ন হয়েছে। এখন রোড মার্কিংসহ শেষ পর্যায়ের কিছু কাজ চলছে।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগস্টের মধ্যেই সেতু দুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। সার্ভিস লেন চালু হলে বিদ্যমান নিচের সড়কটি বন্ধ করে সেখানে মূল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ভায়াডাক্ট নির্মাণের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
পুরোনো সেতুগুলোও পর্যায়ক্রমে সরিয়ে ফেলা হবে। তুরাগ নদীর পানি চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নিচের অংশে কোনো স্থায়ী বাঁধ বা সড়ক রাখা হবে না।
এ এলাকায় প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি টোল প্লাজাও নির্মাণ করা হচ্ছে। ভারী যানবাহনের চাপ সামলাতে এখানে প্রশস্ত ভায়াডাক্ট ও শক্তিশালী পাইল ক্যাপ তৈরি করা হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সামনে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সম্প্রসারিত অংশের সঙ্গে ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ তৈরির কাজও এগিয়েছে। সংযোগস্থলে ইতোমধ্যে স্প্যান বসানো হয়েছে।
কাওলা রেলগেট পর্যন্ত বেশ কয়েকটি স্প্যান স্থাপন করা হলেও কর্মক্ষেত্র বা ওয়ার্কিং ইয়ার্ডের কারণে কাওলা থেকে বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত কিছু অংশে এখনো কাজ শুরু হয়নি।
বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের পূর্ব পাশ থেকে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের বটতলা মোড় পর্যন্ত সব পিলার ও পিলার ক্যাপের কাজ শেষ হয়েছে। স্টেশনের সামনে স্থাপন করা হয়েছে চারটি স্প্যান।
বটতলা মোড় থেকে আব্দুল্লাহপুর অংশে স্প্যান স্থাপন ও ডেক ঢালাই শেষ। বর্তমানে সেখানে সাইড ব্যারিয়ার নির্মাণের কাজ চলছে। তবে আব্দুল্লাহপুর মোড়ে বিআরটি ফ্লাইওভারের ওপর এখনো তিনটি স্প্যান বসানো বাকি রয়েছে।
আব্দুল্লাহপুর থেকে উত্তরা সুইচগেট, কামারপাড়া হয়ে ধউর মোড় পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের প্রধান কাঠামোর বড় একটি অংশ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। ডেক স্ল্যাবের ফিনিশিং, ওয়াটারপ্রুফিং, পেভমেন্ট, কংক্রিট ডিভাইডার ও সাইড ব্যারিয়ারের মতো কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
কামারপাড়া পেরিয়ে প্রত্যাশা সেতুর পর এক্সপ্রেসওয়েটি ধউরের দিকে বাঁক নিয়েছে। সেখানে বড় গোলচত্বরসহ একটি ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে স্থানীয় সড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ের মধ্যে যানবাহন চলাচলে এই ইন্টারচেঞ্জ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ধউর মোড়ে গাবতলী, উত্তরা এবং আশুলিয়া-বাইপাইলমুখী তিনটি দিকের সংযোগ তৈরিতে র্যাম্প ও জংশনের নির্মাণকাজও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে আশুলিয়া বাজার থেকে বাইপাইল অংশেও কাজ দৃশ্যমানভাবে এগিয়েছে। জিরাবো পর্যন্ত স্ল্যাব ঢালাই ও ব্যারিয়ার নির্মাণ হয়েছে। বাইপাইল পর্যন্ত কলাম নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। বাইপাইল থেকে আশুলিয়া থানা এবং আশুলিয়া থানা থেকে শ্রীপুর অংশেও বিভিন্ন পর্যায়ের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি বর্তমানে প্রায় ৬৫ শতাংশ। নতুন সময়সীমা অনুযায়ী ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর দুই বছর ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড থাকবে। এই সময়ে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ব্যয়ে তা সংশোধন করতে হবে।
আব্দুল্লাহপুর থেকে ধউর পর্যন্ত এক পাশের সড়কে কার্পেটিংয়ের কাজও প্রায় শেষ। সুইচগেট এলাকায় সড়ক প্রশস্ত করার কাজ চলায় সামান্য অংশে চূড়ান্ত কার্পেটিং বাকি রয়েছে। ওই অংশও পর্যায়ক্রমে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে পল্লী বিদ্যুতের ৩৩ কেভি ও ১১ কেভি বিদ্যুৎলাইন স্থানান্তর। আশুলিয়া থেকে বাইপাইল পর্যন্ত বিদ্যুৎলাইন স্থানান্তরের কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে ফ্যান্টাসি কিংডম থেকে নারী ও শিশু হাসপাতাল হয়ে বাইপাইল পর্যন্ত রিজিড পেভমেন্ট নির্মাণের কাজ চলছে। আশুলিয়া থেকে নারী ও শিশু হাসপাতাল পর্যন্ত এক পাশের প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কের কাজ শেষ হয়েছে।
২০১৭ সালে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। সে সময় ২০২২ সালের জুনে প্রকল্প শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে ২০২২ সালের জুনে প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করে ব্যয় বাড়িয়ে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা করা হয়। ওই বছরের ১২ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
এরপর তিন বছর আট মাসের মাথায় প্রকল্পের ব্যয় আরও বড় পরিমাণে বাড়ানো হয়। সর্বশেষ অনুমোদনে ব্যয় ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি। পাশাপাশি ভ্যাট ও ট্যাক্সের পরিবর্তন, নতুন কিছু কাজ যুক্ত হওয়া এবং ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরের ব্যয়ও প্রকল্পের মোট খরচ বাড়িয়েছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামানের মতে, টার্নকি পদ্ধতিতে একই ঠিকাদার নকশা থেকে নির্মাণ পর্যন্ত কাজ করায় প্রকল্পের সমন্বয় সহজ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এত বড় ও জটিল অবকাঠামো প্রকল্পে শুরুতেই জমি, ড্রেনেজ এবং ভবিষ্যতে যুক্ত হতে পারে এমন উপাদানগুলো পরিকল্পনায় রাখা প্রয়োজন ছিল।
তার মতে, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা নির্ধারণের সময় যে ব্যয় ধরা হয়েছিল, পরবর্তীতে তার সঙ্গে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত যুক্ত হয়েছে। তাই এত বড় ব্যয় বৃদ্ধির পরও প্রকল্পটি আগের মতো অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক থাকবে কি না, তা নতুন করে পরীক্ষা করা দরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব শুধু নির্মাণ ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয়, টোল আদায়, যানবাহনের চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সুবিধার সঙ্গে নতুন ব্যয়ের তুলনামূলক হিসাবও করা প্রয়োজন।
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মূল অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ কিলোমিটার। এর সঙ্গে থাকবে ১৪টি র্যাম্প, যেগুলোর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার।
প্রকল্পের অংশ হিসেবে নবীনগরে প্রায় ১ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার উড়ালপথ এবং আশুলিয়া-ধউর বেড়িবাঁধ এলাকায় প্রায় ২ দশমিক ৭২ কিলোমিটার সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এই সেতু নির্মাণের ফলে আশুলিয়া বিলের পানিপ্রবাহে বাধা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৪ দশমিক ২৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৮ কিলোমিটার ড্রেনেজ-ডাক্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্মাণকাজ শেষ হলে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে রাজধানীর সঙ্গে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটি এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-জামালপুর, ঢাকা-মানিকগঞ্জ-তেঁতুলিয়া এবং ঢাকা-মাওয়া-বরিশাল মহাসড়কের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ সহজ হবে।
তবে এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারের জন্য যানবাহনকে নির্ধারিত হারে টোল দিতে হবে। ফলে প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়ন যেমন রাজধানীর যানজট ও দীর্ঘ যাত্রার সময় কমাতে পারে, তেমনি বিপুল ব্যয়ের কারণে এর আর্থিক টেকসইতা নিশ্চিত করাও হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আমার বাঙলা/ রাব্বি