রাজীব দাস
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গতকাল শনিবার শুরু হয়েছে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। রাজধানী নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনের প্রতিপাদ্য ধরা হয়েছে, স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নির্মাণ। ২০২৬ সালে চতুর্থবারের মতো ব্রিকসের সভাপতিত্ব পেয়েছে ভারত, এর আগে এই দায়িত্ব তারা পালন করেছিল ২০১২, ২০১৬ ও ২০২১ সালে। সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লি পৌঁছেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মতো বিশ্বনেতারা। মিসর, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও অংশ নিচ্ছেন এই আয়োজনে।
কিন্তু এই বিশাল কূটনৈতিক আসরে একটি নাম নেই। প্রতিবেশী বাংলাদেশ। আর সেই অনুপস্থিতিই এখন দিল্লি ও ঢাকা উভয় জায়গাতেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। ঘটনার সূত্রপাত আগস্ট মাসে। ভারত সে সময় আঞ্চলিক জোটগুলোর সভাপতি দেশগুলোকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানায়। বাংলাদেশ যেহেতু এই মুহূর্তে বিমসটেকের সভাপতি, তাই সেই সূত্র ধরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের কাছেও একটি আমন্ত্রণ পৌঁছায়। বাংলাদেশ সরকার প্রথমে ভেবেছিল, এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই তারেক রহমানকে পাঠানো আমন্ত্রণ। পরে স্পষ্ট হয়, ভারত তারেক রহমানকে ডেকেছে কেবল বিমসটেক চেয়ারম্যান পরিচয়ে, বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে নয়।
এই ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসার পর ঢাকার প্রতিক্রিয়া হয়েছে তীব্র। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবির সাংবাদিকদের সরাসরি বলেছেন, আমরা কীভাবে যাব। বাংলাদেশ সরকারের কাউকে কি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ডাকা হয়নি। তার এই মন্তব্যের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশ কোনো পর্যায়েই এবারের সম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব পাঠাচ্ছে না। বিএনপির প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি একে অভিহিত করেছেন হতাশাজনক বলে, এবং জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে সইকৃত একশোর বেশি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এখন নতুন করে পর্যালোচনার আওতায় আনা হচ্ছে।
এই কূটনৈতিক অস্বস্তির পেছনে একটিমাত্র কারণ নেই। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ভারতে পালানোর পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে চিড় ধরেছিল। এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং তারেক রহমান দেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগত চিঠি পাঠিয়ে জনাব তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান। সেই সূত্র ধরে আগস্টের তেইশ তারিখ থেকে তারেক রহমানের ভারত সফরের কথা ছিল। কিন্তু সেই সফর স্থগিত হয়ে যায়, যার সুনির্দিষ্ট কারণ কোনো পক্ষই খোলাসা করেনি।
এর মধ্যেই যুক্ত হয় আরেকটি ঘটনা। নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশি সংবাদদাতাদের একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে, এবং তার পরপরই দুই দেশের মধ্যে চলমান আলোচনা থমকে যায়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল অবশ্য এই বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য জানাতে রাজি হননি।
এই পুরো ঘটনাক্রম বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশ বহুদিন ধরেই ব্রিকসে যোগ দিতে চেষ্টা করে আসছে। ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত পঞ্চদশ সম্মেলনের আগে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্যপদের জন্য আবেদন করে। চীন তখন থেকেই এই আবেদনের পক্ষে সরব সমর্থন জানিয়ে আসছে। রাশিয়াও একই অবস্থান নিয়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ঢাকা সফরে এসে ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরাও জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের আগ্রহকে তার দেশ ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করবে।
বাংলাদেশের এই আগ্রহের পেছনে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দুই ধরনের হিসাব কাজ করছে। ২০২৬ সালেই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন হওয়ার কথা, যার ফলে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে পাওয়া বাণিজ্য সুবিধা কমে আসবে। এই পরিস্থিতিতে নতুন বাজার ও বিনিয়োগের উৎস খুঁজতে ব্রিকসের সদস্যপদকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখছে ঢাকা। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে ভৌগোলিকভাবেও বাংলাদেশ চীন ও রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশীদার। তবে ব্রিকসের বর্তমান বিন্যাসে বাংলাদেশ এখনো সদস্য নয়, এমনকি পর্যবেক্ষকও নয়।
২০০৬ সালে চার দেশ নিয়ে যাত্রা শুরু করা ব্রিকস এখন এগারো সদস্যের একটি জোট, যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দশটি অংশীদার দেশ। বেলারুশ, বলিভিয়া, কিউবা, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম এই অংশীদার তালিকায় রয়েছে। এছাড়া তুরস্ক, আজারবাইজান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আলজেরিয়া, ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়াসহ প্রায় ত্রিশটির বেশি দেশ পূর্ণ সদস্যপদ বা অংশীদারিত্বের জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে।
তবে সম্প্রসারণের গতি নিয়ে জোটের ভেতরেই মতভেদ স্পষ্ট। চীন ও রাশিয়া দ্রুত সম্প্রসারণের পক্ষে, যাতে পশ্চিমা আর্থিক আধিপত্যের বিপরীতে একটি শক্তিশালী পাল্টা কাঠামো দাঁড় করানো যায়। অন্যদিকে ভারত ও ব্রাজিল সতর্ক ও মানদণ্ডভিত্তিক মূল্যায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ভারতের স্পষ্ট অবস্থান হলো, নতুন কোনো সদস্য গ্রহণের আগে বিদ্যমান সব সদস্য দেশের সম্মতি প্রয়োজন, এবং প্রার্থী দেশকে অবশ্যই প্রতিটি সদস্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। পাকিস্তানের সদস্যপদ প্রশ্নে ভারতের আপত্তি সুবিদিত, আর সেই একই কাঠামোর মধ্যেই বাংলাদেশের আবেদনও এখন আটকে আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ না দেওয়ার এই সিদ্ধান্তে ভারতের সতর্ক কূটনীতির ছাপ স্পষ্ট। পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান এখনো সাংঘর্ষিক, এবং তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এমন পরিস্থিতিতে একটি বহুপাক্ষিক মঞ্চে বাংলাদেশকে পূর্ণ মর্যাদায় ডাকা ভারতের জন্য রাজনৈতিকভাবে জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলেই অনেকে মনে করছেন।
অন্যদিকে ঢাকার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি স্রেফ একটি প্রটোকলগত ভুল বোঝাবুঝি নয়। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে, এবং একইসঙ্গে ব্রিকস সদস্যপদপ্রত্যাশী দেশ হিসেবে, এই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে আমন্ত্রণ না পাওয়াকে বাংলাদেশ দেখছে কূটনৈতিক অবজ্ঞা হিসেবে। একশোর বেশি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত সেই ক্ষোভেরই প্রতিফলন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের বিষয়টি নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়া হবে। অর্থাৎ সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি, তবে আস্থার জায়গাটি স্পষ্টতই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ব্রিকসের সদস্যপদ প্রশ্নে বাংলাদেশের অপেক্ষা তাই আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল, কারণ এই মুহূর্তে জোটের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য দেশটির সঙ্গেই ঢাকার সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি জটিল।
এই সম্মেলন তাই কেবল বিশ্বঅর্থনীতি বা বহুপাক্ষিকতার আলোচনার মঞ্চ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতির একটি নতুন বাস্তবতাও এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যকার আস্থার সংকট কীভাবে বহুপাক্ষিক কূটনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে, দিল্লি ও ঢাকার সাম্প্রতিক এই টানাপোড়েন তারই একটি জীবন্ত উদাহরণ হয়ে থাকল।