ছবি: সংগৃহীত
জাতীয়

শিল্প উৎপাদনে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, বাড়ছে রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ঝুঁকি

খোন্দকার নিয়াজ ইকবাল

গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট ক্রমেই দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতের জন্য বড় বাধা হয়ে উঠছে। জ্বালানির স্বাভাবিক সরবরাহ না থাকায় বড় শিল্পগোষ্ঠী থেকে শুরু করে টেক্সটাইল, ডাইং, পোশাক, ইস্পাত, খাদ্য ও নিত্যপণ্য উৎপাদনকারী বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, আবার কোথাও স্বাভাবিক সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন হচ্ছে।

শিল্প খাতের এই সংকটের প্রভাব শুধু কারখানার উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আদেশ পূরণে অনিশ্চয়তা, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ একপর্যায়ে প্রায় ১ হাজার ৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। একই সময়ে দৈনিক চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ ছিল প্রায় অর্ধেক।

পরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও মোট গ্যাসের প্রাপ্যতা এখনো চাহিদার তুলনায় কম। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রমে।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, ১০ আগস্ট রাত থেকে তাদের ৫৭টি কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বন্ধ রয়েছে।

মেঘনা গ্রুপ চিনি, ভোজ্যতেল, গম, আটা, ময়দা, সুজি, সিমেন্ট, কাগজ, এলপিজি ও পশুখাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করে। একইভাবে টি কে গ্রুপের প্রায় ২০টি কারখানা বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। নাবিল গ্রুপের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা কমে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমেছে। বিএসআরএমেরও ১০টি প্রধান কারখানা বন্ধ থাকার তথ্য রয়েছে।

শুধু বড় শিল্পগোষ্ঠী নয়, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও জ্বালানি সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। হবিগঞ্জে ১৭১টি কারখানা কয়েক দিন পুরোপুরি বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। নরসিংদী-মাধবদী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।

বিশেষ করে টেক্সটাইল কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক না হলে অনেক কারখানার যন্ত্রপাতি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

জ্বালানি সংকট নিয়ে তৈরি পোশাক খাতেও উদ্বেগ রয়েছে। বিজিএমইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু জানিয়েছেন, বিদেশি ক্রেতারা এখন রপ্তানিকারকদের জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কেও খোঁজ নিচ্ছেন। নতুন অর্ডার দেওয়ার আগে অনেক ক্রেতার প্রশ্ন থাকছে—নির্ধারিত সময়ে পণ্য উৎপাদন ও শিপমেন্ট করা সম্ভব হবে কি না।

তৈরি পোশাক কারখানায় তুলনামূলকভাবে তেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় সরাসরি প্রভাব কিছুটা কম হলেও সুতা উৎপাদনকারী স্পিনিং মিলগুলোতে সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। ফলে পোশাকশিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণগুলোর মধ্যে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহ-বিঘ্ন অন্যতম। ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডে টার্মিনালের বৈদ্যুতিক কেবল ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এটি দুই সপ্তাহের বেশি সময় বন্ধ ছিল।

এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। পরে একটি রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট আংশিকভাবে চালু হলে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১১ দশমিক ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়।

এর আগে বৈরী আবহাওয়ার কারণেও এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। জুলাইয়ের শুরুতে একটি এলএনজি কার্গো টার্মিনালে প্রবেশ করতে না পারায় গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট কমে যায়। ওই সময় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২৫৩ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট, যেখানে সরকারি হিসাবে চাহিদা ছিল প্রায় ৩৮৫ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট।

তবে বর্তমান সংকটের পেছনে শুধু সাময়িক সরবরাহ-বিঘ্ন দায়ী নয়। দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে, বিপরীতে শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। ফলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশে দৈনিক দেশীয় গ্যাস উৎপাদন প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট ছিল। গত এক দশকে সেই উৎপাদন ১০০ কোটির বেশি ঘনফুট কমেছে। বর্তমানে দেশীয় গ্যাস ও এলএনজি মিলিয়ে সর্বোচ্চ সরবরাহ প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।

গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব বিদ্যুৎ খাতেও পড়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে একপর্যায়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৪ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়। পরে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়লে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ প্রায় ৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদনে ফিরতে সক্ষম হয়।

ফলে শিল্পের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাসের অভাবে বয়লার, চুল্লি ও উৎপাদনযন্ত্র স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে সরাসরি উৎপাদন লাইন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

সংকটের মধ্যেও উৎপাদন সচল রাখতে কিছু উদ্যোক্তা বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করছেন। বিশেষ করে ডিজেল ব্যবহার বাড়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং একই সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলে বাড়তি ব্যয়ের চাপ পণ্যের মূল্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে টেক্সটাইল শিল্পে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। শিল্পভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সরবরাহ কমে যাওয়ার পর অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় ৮ পিএসআই চাপের বিপরীতে মাত্র ২ থেকে ৩ পিএসআই গ্যাসচাপ পাওয়া গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে কারখানার মেশিন ও বয়লার পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয় না। ফলে উৎপাদন কমার পাশাপাশি সময়মতো কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পরবর্তী ধাপের শিল্পে সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া একটি সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল। সুতা উৎপাদন, বয়ন, ডাইং, ফিনিশিং এবং পোশাক তৈরির প্রতিটি ধাপ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

একটি ধাপে উৎপাদন বন্ধ বা ধীর হয়ে গেলে তার প্রভাব পরবর্তী ধাপেও পড়ে। এতে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আদেশ সম্পন্ন করা কঠিন হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট তৈরি হলে ক্রেতাদের আস্থাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব কেবল রপ্তানিমুখী শিল্পে সীমিত নয়। চিনি, ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, সুজি, পশুখাদ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনেও গ্যাস ও বিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

এসব পণ্যের উৎপাদন দীর্ঘ সময় কমে গেলে বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে বাজারদরেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, সংকটের সময় প্রয়োজনে পরিকল্পিতভাবে জ্বালানি রেশনিং করা যেতে পারে। তবে কোন শিল্পাঞ্চলে কখন গ্যাসের চাপ কমবে বা সরবরাহে সীমাবদ্ধতা থাকবে—এ বিষয়ে আগাম একটি নির্ভরযোগ্য সময়সূচি থাকা জরুরি।

এতে কারখানাগুলো উৎপাদন পরিকল্পনা, শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা, কাঁচামাল ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানি চালানের সময়সূচি আগেভাগে নির্ধারণ করতে পারবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানি ও টার্মিনাল পরিচালনার সক্ষমতা জোরদার করা এবং জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, একটি এলএনজি টার্মিনালে বড় ধরনের সমস্যা হলে তার প্রভাব শুধু গ্যাস সরবরাহেই আটকে থাকে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শিল্পকারখানা, রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।

তাই সাময়িক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য, স্থিতিশীল ও বহুমুখী জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতির জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

আমার বাঙলা/ রাব্বি

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে যা জানাল দিল্লি

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধ...

প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা পেল নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী

নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলায় উপজেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে বাল্যবিবাহের...

আশুলিয়ায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ৪ সক্রিয় কর্মী গ্রেপ্তার

সাভারের আশুলিয়ায় অভিযান চালিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের চার সক্রিয়...

যৌন ব্যবসার অভিযোগে বাংলাদেশিসহ আটক ২৬

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে বিদেশি নারীদের মাধ্যমে পরিচালিত কথিত যৌন ব্য...

নবনিযুক্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা

সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জা...

সড়কপথে ভোলা, মহাসড়ক নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

দ্বীপ জেলা ভোলাকে দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে রহমতপুর-হিজলা-মে...

দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিন: শুরুর বিপর্যয়ের পর ঘুরে দাঁড়াল বাংলাদেশ

স্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইনে প্রথম টেস্ট জয়ের পর দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশের সাম...

জাতীয় নিকাহ নিবন্ধক ঐক্যজোটের চট্রগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত

সোহেল তাজ, চট্টগ্রাম ব্যুরো: বাংলাদেশ কাজী সমিতি, মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার কল...

ফুড পয়জনিং থেকে নিরাপদ থাকার উপায়

এই সময়ে ফুড পয়জনিং খুবই পরিচিত একটি সমস্যা, কারণ এই সময়ে উচ্চ আর্দ্রতা ও জলী...

স্পর্শিয়ার স্লিভলেস লুকে তোলপাড়

রীতিমতো নেটিজেনদের নজর কেড়েছেন অভিনেত্রী অর্চিতা স্পর্শিয়া। রোদমাখা এক বিকেলে...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা