দেশের কারাগারগুলোকে আধুনিক, মানবিক এবং সংশোধনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে ব্যাপক সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কারা অধিদপ্তর। বর্তমানে ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি বন্দি থাকার কারণে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলার পাশাপাশি কারাবন্দিদের পুনর্বাসন ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
সংস্কার প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘বাংলাদেশ জেল’ নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ কাস্টোডিয়াল অ্যান্ড কারেকশনাল সার্ভিস’ করার উদ্যোগ। একই সঙ্গে বিদ্যমান কারা আইন যুগোপযোগী করে নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাবও রয়েছে। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত ১,৫০০টি নতুন পদ সৃষ্টির সুপারিশ করা হয়েছে।
কারা ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ই-প্রিজন সার্ভিস ও ই-প্রিজন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল জামিন প্রক্রিয়া, অনলাইন সাক্ষাৎ ব্যবস্থাপনা এবং বন্দি ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ গ্রহণের জন্য একটি আধুনিক কল সেন্টার বা হটলাইন চালুর প্রস্তাবও রয়েছে।
নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ কারাগারগুলোতে মোবাইল ফোন জ্যামার স্থাপনের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে কারাগারের ভেতর থেকে অবৈধ যোগাযোগ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
কারাগারে চিকিৎসক সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ৪৪টি নতুন অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে ১৫১ জন চিকিৎসককে প্রেষণে নিয়োগ এবং সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগের বিষয়টিকে জরুরি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, চিকিৎসক সংকটের কারণে অতীতে বহু বন্দি সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
শুধু বন্দি রাখাই নয়, মুক্তির পর সমাজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে তাদের প্রস্তুত করাও এই সংস্কার পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য। এজন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বন্দিদের খাদ্যমান উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রস্তাবে দৈনিক ১৮০ গ্রাম প্রোটিন নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে, যা অনুমোদন পেলে নতুন খাদ্যতালিকা কার্যকর হবে।
নারী বন্দি এবং তাদের সঙ্গে থাকা শিশুদের জন্য আরও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে দেশের সব কেন্দ্রীয় কারাগারে পর্যায়ক্রমে ডে-কেয়ার সেন্টার, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার এবং হাইজিন কর্নার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে ১৫টি কেন্দ্রীয় কারাগারে এসব সুবিধা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিনের মতে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কারাগার শুধুমাত্র বন্দি রাখার স্থান নয়; বরং সংশোধন ও পুনর্বাসনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হয়। তাই নতুন নামকরণ এবং আধুনিক আইনি কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ সময়োপযোগী। তবে তিনি মনে করেন, নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি চিকিৎসা, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, জনবল এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থার বাস্তব উন্নয়ন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অন্যদিকে গবেষক ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ড. মো. সহিদুজ্জামান বলেন, একটি আধুনিক কারাগার ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত মানবাধিকার, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং পুনর্বাসন। কারিগরি প্রশিক্ষণ, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, নারী ও শিশুবান্ধব সুবিধা এবং খাদ্যমান উন্নয়নের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বন্দিদের সমাজে পুনরায় একীভূত হওয়ার সুযোগ আরও বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কারা অধিদপ্তরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত অনুমোদন, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের কারাগারগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক সংশোধন ও পুনর্বাসন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
বর্তমান বাস্তবতায় শুধু কারাগারের নাম পরিবর্তন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। জনবল বৃদ্ধি, উন্নত চিকিৎসাসেবা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নিরাপত্তা জোরদার এবং বন্দিদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি কার্যকর ও মানবিক কারা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে এই সংস্কার পরিকল্পনার প্রকৃত সাফল্য।
আমার বাঙলা/ রাব্বি