সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তামান্না আক্তার। নিজ উপজেলা চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণের মেধাতালিকায় প্রথম এবং পুরো জেলায় ১১তম স্থান অর্জন করেছিলেন তিনি। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও শেষ পর্যন্ত হাতে পাননি নিয়োগপত্র।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ভেরিফিকেশনে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে তামান্নার দাবি। অথচ তিনি বা তার পরিবারের কোনো সদস্য কখনো রাজনীতি বা কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তার স্বামী পুলিশের চাকরি করেন।
নিয়োগপত্র না পাওয়ায় তার ফেসবুক পোস্টে নিজের ক্ষোভ ও হতাশার কথা তুলে ধরে লিখেন, জন্মই আমার আজন্ম পাপ! আমি এ রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধিক্কার জানাই! এ যেন কষ্ট করে পাওয়া চাকরিটাকে ছিনিয়ে নেওয়া, এ যেন মায়ের কোল থেকে একটা সন্তানকে ছিনতাই করা!
তামান্না জানান, প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় তিনি চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তার সব শিক্ষাগত সনদও ভালো। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে মতলব দক্ষিণ উপজেলার মেধাতালিকায় প্রথম এবং পুরো চাঁদপুর জেলায় ১১তম স্থান অর্জন করেন তিনি।
তবে গত ২৪ সেপ্টেম্বর তার নামে কোনো নিয়োগপত্র জারি হয়নি। তামান্নার ভাষ্য, পুলিশ বা জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার ভেরিফিকেশনে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সব ধাপে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর দীর্ঘ আট মাস অপেক্ষা করেও রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তামান্না আরও বলেন, তিনি কিংবা তার পরিবারের কেউ কখনো কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। চাকরি পাওয়ার সব ধাপ পেরিয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি দেশের মেধাবীদের মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
শুধু তামান্না আক্তার নন, গত ২৪ সেপ্টেম্বর জারি করা আদেশে সারাদেশের প্রায় দেড় হাজার সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী নিয়োগপত্র থেকে বাদ পড়েছেন বলে জানা গেছে। এসব প্রার্থীর নামে কোনো নিয়োগপত্র ইস্যু করা হয়নি। তবে কী কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো কারণ জানানো হয়নি।
বাদ পড়া কয়েকজন প্রার্থী ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন, পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার ভেরিফিকেশনে নেতিবাচক প্রতিবেদন থাকায় তাদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। তবে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি।
এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অধিদপ্তরের অন্য কর্মকর্তারাও গণমাধ্যমের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইছেন না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিয়ে নীরব রয়েছেন।
ফলে নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন। বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা তৈরি হয়েছে।
গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১ জেলায় পার্বত্য তিন জেলা বাদে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষাটি বহুনির্বাচনী পদ্ধতিতে নেওয়া হয়। এতে উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা হয়।
এরপর গত ৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়। জেলাভিত্তিক উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকাও প্রকাশ করা হয়।
চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও এখন প্রায় দেড় হাজার প্রার্থী নিয়োগপত্র না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে বাদ পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।