কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের ধরলা নদীতীরবর্তী প্রত্যন্ত গ্রাম দলনের এক কৃষক পরিবারের মেয়ে সুইটি আক্তার। একসময় নিজের বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করে যে কিশোরী আলোচনায় এসেছিলেন, আজ সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে গ্রামের কিশোরীদের বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন করে তুলছেন। তার নিরলস প্রচেষ্টায় বদলাতে শুরু করেছে গ্রামের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি।
কৃষক দম্পতি তোফাজ্জল হোসেন ও হাসেনা বেগমের মেয়ে সুইটি আক্তার অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় পরিবারের পক্ষ থেকে তার বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি দৃঢ়ভাবে সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। শেষ পর্যন্ত বিয়েটি ভেঙে যায়। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, উপযুক্ত বয়স হওয়ার আগে এবং স্বাবলম্বী না হয়ে কখনো বিয়ে করবেন না।
চলতি বছর তিনি কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ করেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের শিক্ষার খরচ চালিয়েছেন। এরপর থেকেই গ্রামের কিশোরীদের নিয়ে উঠান বৈঠক, সচেতনতামূলক সভা এবং বিভিন্ন বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্য ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধবিষয়ক আলোচনা পরিচালনা করে আসছেন।
আমার বাংলার সঙ্গে আলাপকালে সুইটি বলেন, “আমার বড় বোনের বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১০ বছর বয়সে। পরের বছরই তিনি সন্তানের মা হন। এরপর থেকেই নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। সেই অভিজ্ঞতা কাছ থেকে দেখেই আমি নিজের বিয়ের প্রস্তাবে ‘না’ বলেছিলাম।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার বিয়ের কথাবার্তা অনেক দূর এগিয়েছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি। শেষ পর্যন্ত বিয়েটি ভেঙে যায়। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, উপযুক্ত বয়স হওয়ার আগে এবং স্বাবলম্বী না হয়ে কখনো বিয়ে করব না।”
তিনি বলেন, “শুরুতে মানুষের নানা কথা শুনতে হয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষকে বোঝানো সহজ ছিল না। তবে এখন অনেক অভিভাবক মেয়েদের বাল্যবিয়ে না দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন। আমি চাই, গ্রামের কিশোরীরাই একদিন এই সচেতনতার নেতৃত্ব দিক।”
স্থানীয় বাসিন্দা শাবানা বেগম বলেন, “আমার নিজের বিয়ে হয়েছিল ১৪ বছর বয়সে। সেই কষ্ট আমি বুঝি। সুইটির কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দেব না। ওর প্রচারণা আমাদের সচেতন করেছে।”
বকসীগঞ্জ রাজিবিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, তাদের অনেক সহপাঠীর অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গেছে। সুইটির কাছ থেকে বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিক জানার পর তারা নিজেরাও এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং পরিবারকেও সচেতন করছে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আর্জিনা বেগম বলেন, “এ এলাকায় এখনও বাল্যবিয়ের প্রবণতা রয়েছে। তবে সুইটির উদ্যোগে অনেক পরিবার সচেতন হচ্ছে। কিশোরীরাও স্বাস্থ্য ও অধিকার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পাচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।”
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের পাশাপাশি সুইটি মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়েও কাজ করছেন। তিনি কিশোরীদের নিয়মিত স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার, সময়মতো পরিবর্তন, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেন। তার উদ্যোগে স্থানীয় বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষকের কাছে জরুরি প্রয়োজনে স্যানিটারি ন্যাপকিন সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
সুইটির মা হাসেনা বেগম বলেন, “এক মেয়ের বাল্যবিয়ে দিয়ে ভুল করেছি। পরে সুইটির ক্ষেত্রেও একই ভুল করতে চেয়েছিলাম। এখন মনে হয়, সেই ভুল থেকে বেঁচে গেছি। আজ আমার মেয়ে অন্য মেয়েদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য কাজ করছে। ওকে নিয়ে আমরা গর্বিত।”
স্থানীয়দের মতে, একজন তরুণীর সাহসী সিদ্ধান্ত শুধু তার নিজের জীবনই বদলায়নি; তার উদ্যোগে বদলাতে শুরু করেছে পুরো গ্রামের সামাজিক চিত্র। বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা, মেয়েদের শিক্ষার প্রসার এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়ে সুইটি আক্তার হয়ে উঠেছেন গ্রামের কিশোরীদের অনুপ্রেরণার প্রতীক।
আমার বাঙলা/ রাব্বি