যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের নোবলসভিল দুই দিনের জন্য যেন রূপ নিয়েছিল এক টুকরো বাংলায়। সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, বইমেলা, পিঠা উৎসব এবং শিশুদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে মুখর ছিল ১৬তম উত্তর আমেরিকা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন (NABLCC) ২০২৬। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয় নিয়েই শেষ হয়েছে এ আয়োজন।
সম্মেলনে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে সাহিত্যিক, গবেষক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিকর্মী এবং বাংলা ভাষাপ্রেমীরা একত্রিত হন। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ভৌগোলিক দূরত্ব যতই বাড়ুক, মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
দুই দিনব্যাপী আয়োজনে সংগীত, সাহিত্যচর্চা, নৃত্য এবং শিল্পকলার সমন্বয়ে প্রবাসী বাঙালিদের জন্য তৈরি হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিবেশ। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাতনি অনিন্দিতা কাজী। তিনি নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবতা এবং সাম্যের দর্শনের কথা তুলে ধরে বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে এই মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়া সময়ের দাবি।
সংগীত পরিবেশনায় দর্শকদের মুগ্ধ করেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী দিলশাদ নাহার কণা। পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পী এমাদ রনি, আকাশ ও জনির পরিবেশনাও দর্শকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। বাংলা গানের সুরে প্রবাসের পরিবেশ যেন মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাংলা বইমেলা। প্রথমবারের মতো ইন্ডিয়ানার এই অঞ্চলে অনুষ্ঠিত বইমেলায় নিউইয়র্কভিত্তিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মুক্তধারা অংশগ্রহণ করে। সমসাময়িক সাহিত্য, গবেষণাধর্মী বই এবং বিভিন্ন প্রকাশনা ঘুরে দেখেন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, প্রবাসের নতুন এলাকাগুলোতেও বাংলা বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ আশাব্যঞ্জক।
সম্মেলনের আহ্বায়ক আজাদ হোসেন সফল আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে প্রবাসীদের সম্মিলিত উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ভারতের কনসাল জেনারেল সোমনাথ ঘোষ। বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
শিকাগোতে বাংলাদেশের অনারারি কনসাল জেনারেল মুনির চৌধুরী ইন্ডিয়ানায় এমন বৃহৎ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের সফল আয়োজনের জন্য উদ্যোক্তাদের অভিনন্দন জানান।
সম্মেলনের নীরব সংগঠকদের একজন মাসুম মাহবুব বলেন, ইন্ডিয়ানায় এ ধরনের আন্তর্জাতিক মানের সাংস্কৃতিক আয়োজন ভবিষ্যতে আরও বড় উদ্যোগ গ্রহণে প্রবাসী বাঙালিদের অনুপ্রাণিত করবে।
দুই দিনের অনুষ্ঠানে শিশুদের কবিতা আবৃত্তি, পিঠা উৎসব, সাহিত্য আলোচনা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং পারিবারিক মিলনমেলা বিশেষ মাত্রা যোগ করে। শিশুদের কণ্ঠে বাংলা কবিতা এবং ঐতিহ্যবাহী বাংলা খাবারের আয়োজন প্রবাসেও দেশের আবহ ফিরিয়ে আনে।
সম্মেলনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দেন আজাদ হোসেন, দিলরুবা আমিন মিতা ও অঞ্জন রায়। আয়োজকদের আন্তরিকতা ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় সন্তোষ প্রকাশ করেন অংশগ্রহণকারীরা।
অনুষ্ঠানে ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের সেক্রেটারি অব স্টেট দিয়েগো মোরালেসের শুভেচ্ছাবার্তা পাঠ করে শোনানো হয়। এছাড়া অতিথিদের সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
বাংলা সাহিত্যবিষয়ক আলোচনা পর্বে অংশ নেন ড. মীর মাসুম আলী, আজাদ হোসেন, আব্দুস সামাদ, লেখক ও সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন, সাংবাদিক হাসানুজ্জামান সাকী এবং পিনাকী তালুকদার। আলোচনায় বক্তারা বলেন, বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে প্রবাসী বাঙালিদের অবদান দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রথম দিনের আলোচনা পর্বে বক্তব্য দেন সোনিয়া আজাদ, লীনা আলী, ড. ওয়াকার মোয়াজ্জেম ও লিখন রশীদ। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন নন্দিতা দাস গাঙ্গুলি, বিশ্বজিৎ সাহা এবং দিদারুল আলম পান্না।
সম্মেলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ ছিল আলোকচিত্র ও শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি পোশাক, অলংকার, দেশীয় খাবারের স্টল এবং বিভিন্ন প্রজন্মের প্রবাসী বাঙালিদের পারস্পরিক পরিচয় ও মতবিনিময়ের সুযোগ পুরো আয়োজনকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
২৪ ও ২৫ জুলাই অনুষ্ঠিত এ দুই দিনের সম্মেলনের মিডিয়া পার্টনার ছিল প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা, সময় টেলিভিশন, টিবিএন-২৪ এবং দেশি ট্রিবিউন ডটকম।
দুই দিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও অংশগ্রহণকারীদের বিশ্বাস, প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই ধারাবাহিক চর্চা আগামী প্রজন্মের মধ্যেও সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং বিশ্বজুড়ে বাংলা সংস্কৃতির পরিচয়কে আরও সমৃদ্ধ করবে।