তিনি জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনট গ্রামের নাসিমা খানম। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদাই নূর মহিলা উন্নয়ন সংস্থা এবং নূর-নাহিদ লেডিস টেইলার্স অ্যান্ড প্রশিক্ষণ সেন্টার-এর মাধ্যমে এক হাজারের বেশি নারী সেলাই ও বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন।
নাসিমা খানম জানান, ছোটবেলায় তাঁর মা বটি দিয়ে কাপড় কেটে ছোট বোনের জন্য পোশাক তৈরি করতেন। মায়ের সেই কাজ দেখেই সেলাইয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায়। পরে নিজেই কাঁচি দিয়ে কাপড় কেটে হাতে সেলাইয়ের মাধ্যমে পোশাক তৈরির চেষ্টা শুরু করেন। সেই ছোট্ট চেষ্টাই একসময় জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়।
অল্প বয়সে বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব বাড়লেও স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি। পরিবারকে সহযোগিতা করার তাগিদ থেকেই নিজেকে দক্ষ করে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। এ পথচলায় স্বামী ও শাশুড়ির উৎসাহ তাঁকে সাহস জুগিয়েছে।
২০০৬ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ নেন নাসিমা। এরপর ক্রিস্টাল, পুঁথি ও পাথরের কাজ, ব্যবসা ব্যবস্থাপনা এবং উচ্চতর উদ্যোক্তা উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। একই বছরের শেষ দিকে ২৫ জন নারীকে নিয়ে তিন মাসব্যাপী প্রথম প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর কার্যক্রম বিস্তৃত হতে থাকে। বর্তমানে তাঁর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে এক হাজারের বেশি নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ নিজ কর্মসংস্থান গড়ে তুলেছেন।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুনট গ্রামের কবিতা রানী বলেন, “নাসিমা আপার কাছে সেলাই শেখার পর আমার জীবন বদলে গেছে। আগে পরিবারের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এখন নিজের আয় দিয়ে সংসারে সহযোগিতা করতে পারি। তিনি শুধু সেলাই শেখাননি, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতেও শিখিয়েছেন।”
নারী উন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থানে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নাসিমা খানম উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা সম্মাননা লাভ করেন। পরে রাজশাহী বিভাগ থেকে সফল আত্মকর্মী হিসেবে জাতীয় যুব পুরস্কার অর্জন করেন। সর্বশেষ সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশন বাংলাদেশ ট্রাস্ট তাঁকে গোল্ড অ্যাওয়ার্ড-২০২৫ প্রদান করে।
দুই সন্তানের জননী নাসিমা খানম বলেন, “আমি চাই গ্রামের প্রতিটি নারী কোনো না কোনো দক্ষতা অর্জন করে নিজের পায়ে দাঁড়াক। একজন নারী স্বাবলম্বী হলে শুধু তাঁর নিজের জীবন নয়, বদলে যায় একটি পরিবার, বদলে যায় সমাজও।”
কালাই উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. শাহ আলম শেখ বলেন, “নাসিমা খানম যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি শুধু নিজের কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করেননি, তাঁর প্রশিক্ষণে এক হাজারের বেশি নারী দক্ষতা অর্জন করে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়।”
আমার বাঙলা/ রাব্বি