দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট চলমান থাকলেও প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস চুরি, অবৈধ ব্যবহার এবং পাইপলাইনের ত্রুটির কারণে অপচয় হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, এই অপচয়ের আর্থিক মূল্য প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের জ্বালানি খাতের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকার গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় সিস্টেম লস ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। বিতরণ কোম্পানিগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, সিস্টেম লস এখনো ৯ শতাংশেরও বেশি রয়েছে।
শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত
ঢাকার অদূরে আশুলিয়াসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের স্বল্পচাপ ও অনিয়মিত সরবরাহের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি না থাকায় জেনারেটর পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়ছেন উদ্যোক্তারা।
শুধু শিল্প খাতই নয়, গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। এতে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা এবং বাড়ছে পরিচালন ব্যয়।
চুরি ও লিকেজে বাড়ছে ক্ষতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাসের বড় একটি অংশ অবৈধ সংযোগ, চুরি এবং পুরোনো পাইপলাইনের লিকেজের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদের বড় ধরনের অপচয় ঘটলেও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস জানিয়েছে, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং লিকেজযুক্ত পাইপলাইন মেরামতের কাজও জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে পাইপলাইন সংস্কারের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
কঠোর পদক্ষেপের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, তা বাস্তবায়নে প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি ও জবাবদিহিতা। দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা শিথিলতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সিস্টেম লস উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
তাদের মতে, গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, নিয়মিত পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণ, অবৈধ সংযোগ দ্রুত বিচ্ছিন্ন করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে অপচয় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
চাহিদা ও সরবরাহের বড় ব্যবধান
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি। তবে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ঘাটতির কারণে শিল্প, পরিবহন এবং আবাসিক খাতের গ্রাহকরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যখন গ্যাসের ঘাটতি দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, অন্যদিকে সিস্টেম লস কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব হবে এবং আমদানিনির্ভরতার চাপও কিছুটা কমবে।
আমার বাঙলা/ রাব্বি