দেশকে অস্থিতিশীল করতে কেউ কেউ নানা ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ধরনের অপতৎপরতার বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানের শুরুতে গীতা পাঠ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে কেউ কেউ নানা ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মানুষকে উসকানি দেওয়ারও অপচেষ্টা চলছে। দেশে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানি বা বিদ্বেষ যেন সামাজিক অস্থিরতার কারণ না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এই দেশ আপনার, আমার, আমাদের সবার।’ নাগরিক হিসেবে এ দেশের প্রতিটি মানুষের অধিকার সমান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবনযাপন করা প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। বিএনপি ও বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে—‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’ ধর্ম যার যার হলেও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জন্মাষ্টমীর পাশাপাশি সামনে দুর্গাপূজা। সব ধর্মীয় উৎসব শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপদ পরিবেশে পালনের জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছার পাশাপাশি দুর্গোৎসবের আগাম শুভেচ্ছাও জানান তিনি।
‘সংখ্যালঘু নয়, আমরা বাংলাদেশি’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংখ্যালঘু’ কিংবা ‘সংখ্যাগুরু’ পরিচয়ের চেয়ে সবার বাংলাদেশি পরিচয়ই বড়। দেশের বাইরে গেলে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের কাছে এই পরিচয়ই মুখ্য হয়ে ওঠে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও পরিচয় যেন মানুষের মধ্যে বিভেদ বা বৈষম্য সৃষ্টি করতে না পারে। সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ রাখার লক্ষ্যেই ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে আবহমানকাল ধরে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করে আসছে। তবে সময়ে সময়ে বিভেদ ও বিরোধ সৃষ্টি করে সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করার অপচেষ্টা হয়েছে।
সমাজবিরোধী কোনো অপশক্তি যাতে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং কেউ যাতে বিরাজমান সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
‘কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়তে চায় সরকার’
সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সেই লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী ভাতাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিকদের প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্র তার সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা করবে। একই সঙ্গে নাগরিকরাও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করবে।
রাষ্ট্র, সরকার ও নাগরিকদের পারস্পরিক দায়িত্ব, আস্থা ও আলোচনার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সমাজ ও রাষ্ট্রে কেউ যাতে পিছিয়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
পুরোহিত-সেবাইতদের সম্মানী বিতরণ
অনুষ্ঠানে নয়জন মন্দিরের পুরোহিত ও সেবাইতের মধ্যে সম্মানী বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সারাদেশের পুরোহিত ও সেবাইতদের ব্যাংক হিসাবে EFT-এর মাধ্যমে এ অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়।
এর আগে হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে পুষ্পস্তবক তুলে দেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষে তা গ্রহণ করেন সংসদ সদস্য সুবর্ণা শিকদার ঠাকুর।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আরাধ্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন শুক্রবার। এ উপলক্ষে দিবসটির প্রাক্কালে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী।
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টম তিথিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, অন্যায় ও অশুভ শক্তির বিনাশ এবং ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রী-নেতারা
হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন, সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার, পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও কালবেলার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, স্বামীবাগ ইসকনের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী মহারাজ এবং বিএনপির সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বিমানমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ-উর রহমান, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমান ও ফরহাদ হালিম ডোনার, সহসভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরীসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ।
আমার বাঙলা/ রাব্বি